চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে পাচার: জাতিসংঘ

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১ রাত
  • ৮৫৪০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বেসামরিক চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষরে বাধ্য করার অভিযোগ; যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত, আহত ও নিখোঁজ অনেকে

বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের জন্য পাচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। কমিশনের অনুসন্ধানে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁদের অনেককে পরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। কেউ নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গত ২৬ অক্টোবর রাতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

৪৮ দেশের নাগরিকদের নিয়োগ নিয়ে তদন্ত

তদন্ত কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিককে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা পর্যালোচনা করে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তান রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীরা সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া ব্যক্তি। তাঁদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো।

নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিকের চাকরির প্রলোভন

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী এজেন্ট ও সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, কারখানার শ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো পেশায় কাজের প্রস্তাব দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুশ নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।

নিয়োগকারীরা নিজেদের বৈধ বা সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিত। চাকরির প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখানো হতো। এরপর ভিসা, উড়োজাহাজের টিকিট এবং ভ্রমণের অন্যান্য ব্যবস্থা করে তাঁদের রাশিয়ায় পাঠানো হতো।

রাশিয়ায় গিয়ে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষরের চাপ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে তদন্ত কমিশন। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কাগজপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও কমিশনের সামগ্রিক অনুসন্ধানে এ ধরনের ব্যবস্থার আড়ালে বিদেশিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা উঠে এসেছে।

রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশি নাগরিককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেকে এর শর্ত বুঝতে পারেননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে তাঁকে চুক্তির বিভিন্ন স্থানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। চুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ রুশ ভাষায়। ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামী প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন এবং তাঁর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।

পরিবারে ঋণ, অনিশ্চয়তা ও স্বজন হারানোর বেদনা

চাকরির আশায় বিদেশে যেতে ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ নিয়োগ ফি হিসেবে বিপুল অর্থ দিয়েছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ঋণ করেছেন কিংবা সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। পরে স্বজনের মৃত্যুসংবাদ পেলেও কোনো কোনো পরিবার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। আবার নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও অনেক পরিবার নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিয়োগকারী এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পরিবারের ফোনও ধরত না। ফলে স্বজনের অবস্থান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে পরিবারগুলো দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশির অবস্থান জানার দাবি

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত বছরও রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিদের নিয়োগের বিষয়ে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সতর্ক করা হয়েছিল। কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় যাওয়ার পর অনেক বাংলাদেশিকে যুদ্ধে নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কাজের ভিসায়, আবার কেউ পর্যটক ভিসায় সেখানে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, নতুন করে কোনো বাংলাদেশি যেন রাশিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গত দুই বছরে বৈধভাবে রাশিয়ায় যাওয়া প্রায় সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশির বর্তমান অবস্থানও খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁদের মধ্যে কতজন এখনো সেখানে কাজ করছেন, কতজন যুদ্ধে জড়িয়েছেন এবং কতজন বেঁচে আছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানান তিনি।

শরিফুল ইসলাম হাসান আরও বলেন, পর্যটক ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়টিও তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে পর্যালোচনা করা উচিত। তাঁদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন এবং কতটি পরিবার স্বজনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ জানিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে রাশিয়ার দূতাবাস বাংলাদেশিদের কতটি ভিসা দিয়েছে, সেই তথ্যও সংগ্রহ করা যেতে পারে।

পাচার বন্ধ ও ভুক্তভোগীদের মুক্তির আহ্বান

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী চক্রের সঙ্গে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধানে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা, আর্থিক ও সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর মতো কর্মকাণ্ড বিদেশি নাগরিকদের পাচার করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশন রাশিয়াকে এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ করা, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের মুক্ত করতে রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতারণামূলক নিয়োগ ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে।

শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, যুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রাণ হারানো অত্যন্ত দুঃখজনক। জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তথ্যসূত্র: ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন; ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসানের বক্তব্য; প্রকাশিত সংবাদ, ২৭ অক্টোবর ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad