খেলাপি হয়ে পড়া সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ ও ঋণপত্র (এলসি) সুবিধা দিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধিনিষেধ থেকে সাময়িক অব্যাহতি চেয়েছে কয়েকটি ব্যাংক। গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখা এবং ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায়ের স্বার্থে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এ ছাড় চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে।
তিন মাসের বিশেষ সুবিধা দিয়েও সিটি গ্রুপকে খেলাপি হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ওই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গ্রুপটির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়ে। এতে নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।
২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণজানা গেছে, গত ৩১ মার্চ সিটি গ্রুপের ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখাসহ সাত ধরনের নীতি সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দেয় গ্রুপটি। পরে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) একই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণের বিদ্যমান শ্রেণিমান ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেয়। এতে ওই সময় পর্যন্ত গ্রুপটির প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হয়নি। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এ সুবিধা আর বাড়ানো হয়নি।
গত মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ১৬ হাজার ২৪৬ কোটি এবং নন-ফান্ডেড ঋণ ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক(৩) ধারায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ সুবিধা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে আইনের ১২১ ধারায় সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এ বিধান থেকে অব্যাহতি দিতে পারে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে কয়েকটি ব্যাংক। প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। এতে ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।
নতুন অর্থায়নে থাকবে এসক্রো হিসাবমিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও মূল ব্যবসার বাইরের খাতে বিনিয়োগের কারণে সিটি গ্রুপ সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সংকট থেকে বের করে আনার উপায় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এসক্রো অ্যাকাউন্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন অর্থায়ন থেকে যে আয় হবে, তা থেকে শুধু অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো অর্থ পাবে; অন্য ব্যাংকগুলো ওই অর্থ থেকে টাকা পাবে না। গ্রুপটির বকেয়া ঋণ সমন্বয়ে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ঋণের ডাউন পেমেন্টে বিশেষ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি গ্রুপকে ঋণ দিতে কোনো ব্যাংককে বাধ্য করা হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই ঋণ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। জামানত নিশ্চিত করতে গ্রুপটিকে সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
রমজানের পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার তাগিদএকটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সিটি গ্রুপকে নতুন অর্থায়ন ও এলসি সুবিধা দেওয়া না হলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় আরও কঠিন হতে পারে। এ কারণে ব্যবসা সচল রাখতে আইনি ছাড় চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রুপটির বিভিন্ন ব্র্যান্ড টিকিয়ে রাখা এবং আসন্ন রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া জরুরি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেও প্রতিষ্ঠানটির আমদানি কার্যক্রম সচল রাখা প্রয়োজন।
বৈঠকে গভর্নর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান এক ব্যাংক কর্মকর্তা। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানোর কথাও তিনি বলেছেন বলে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
বিশেষ ছাড় নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শসেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্দিষ্ট কোনো গ্রুপকে লক্ষ্য করে নীতিমালায় ছাড় দেওয়া ইতিবাচক নয়। তবে সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সচল রাখার বিষয় বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর অনুরোধে কিছুটা শিথিলতা দেওয়া হতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণ বা স্থায়ী সমাধান নয়; বরং বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানের বক্তব্য জানতে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক