মেরুদণ্ডের ব্যথায় ব্যাহত দৈনন্দিন জীবন, সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাস জরুরি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ দুপুর
  • ২০৬১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি : এআই দিয়ে তৈরি I
সংসার সামলানো থেকে শুরু করে পেশাগত দায়িত্ব—সব ক্ষেত্রেই ব্যস্ত নারীরা। কিন্তু দৈনন্দিন কাজের চাপ, ভুল দেহভঙ্গি, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কিংবা হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার মতো নানা কারণে অনেক নারী মেরুদণ্ড ও কোমরব্যথায় ভোগেন। সময়মতো কারণ শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসা না নিলে এ সমস্যা দৈনন্দিন কাজ, চলাফেরা এবং জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করতে পারে।

মেরুদণ্ড শরীরের প্রধান কাঠামোগত ভিত্তি। এটি শরীরকে সোজা রাখতে, ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং চলাচলে সহায়তা করে। মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগও বজায় থাকে। তাই মেরুদণ্ডের হাড়, ডিস্ক, পেশি কিংবা স্নায়ুতে সমস্যা হলে ব্যথা, অসাড়তা ও চলাচলে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

নারীদের মেরুদণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি কেন বাড়ে

নারীদের মেরুদণ্ডের সমস্যার পেছনে শারীরিক গঠন, হরমোনের পরিবর্তন, গর্ভাবস্থা, বয়স এবং দৈনন্দিন কাজের ধরন ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।

গৃহস্থালির কাজের সময় বারবার ভারী বালতি বা হাঁড়ি তোলা, দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে কাজ করা কিংবা শিশুকে কোলে নেওয়ার ফলে কোমর ও পিঠের পেশিতে চাপ পড়তে পারে। অন্যদিকে, অফিসে দীর্ঘসময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা এবং ঘাড় নিচু করে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস ঘাড় ও পিঠে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

মেরুদণ্ডের ব্যথার প্রধান কারণ

নারীদের মেরুদণ্ড ও কোমরব্যথার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

১. হরমোনের পরিবর্তন: মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে গেলে হাড়ের ঘনত্ব হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।

২. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি: এসব পুষ্টি উপাদানের অভাবে হাড়ের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩. গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান: শরীরের ওজন ও ভারকেন্দ্রের পরিবর্তনে কোমরে চাপ বাড়তে পারে।

৪. দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা: একটানা বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করলে পেশিতে অস্বস্তি ও ব্যথা হতে পারে।

৫. অতিরিক্ত ওজন: শরীরের বাড়তি ওজন কোমর ও মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

৬. ভুল দেহভঙ্গি: ঝুঁকে বসা, ঘাড় নিচু করে মোবাইল দেখা কিংবা কাজের সময় অনুপযুক্ত ভঙ্গি ব্যথার কারণ হতে পারে।

৭. মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব: এগুলো ব্যথার অনুভূতি বাড়াতে এবং পেশির টান দীর্ঘায়িত করতে পারে।

৮. উঁচু হিলের জুতা: দীর্ঘসময় উঁচু হিল পরলে হাঁটার ধরন ও শরীরের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।

৯. ভুলভাবে ভার তোলা: কোমর বাঁকিয়ে ভারী জিনিস তুললে পেশিতে টান বা আঘাত লাগতে পারে।

১০. শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব: পেট ও পিঠের পেশি দুর্বল হলে শরীরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

১১. অস্টিওপোরোসিস: হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে মেরুদণ্ডের কশেরুকায় ভাঙন বা চিড় ধরার ঝুঁকি বাড়ে।

১২. ডিস্কের সমস্যা: মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষয় বা হার্নিয়েশনের কারণে কোমরব্যথা, পায়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা কিংবা অসাড়তা হতে পারে।

১৩. বয়সজনিত পরিবর্তন ও আর্থ্রাইটিস: বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন অংশে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

১৪. জন্মগত ও গঠনগত সমস্যা: স্কোলিওসিসের মতো মেরুদণ্ডের বক্রতা কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা ও চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। ধূমপান, অপুষ্টি ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনও হাড়ের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যথা কমাতে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন

মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে কাজের সময় সঠিক দেহভঙ্গি অনুসরণ করা, দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে না থাকা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ডেস্কে কাজ করার সময় পিঠের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা ও হালকা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে।

গৃহস্থালির কাজের সময় কোমর অতিরিক্ত বাঁকিয়ে ভার তোলা এড়িয়ে চলতে হবে। ভারী জিনিস তোলার ক্ষেত্রে হাঁটু ভাঁজ করে শরীরের কাছাকাছি রেখে তুলতে হবে। শিশুকে দীর্ঘসময় কোলে নেওয়ার সময়ও শরীরের ভঙ্গির দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শরীরের উপযোগী ব্যায়াম হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হাড়ের দুর্বলতা বা অন্য কোনো রোগ থাকলে ব্যায়াম ও চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যেসব লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন

মেরুদণ্ডের ব্যথার সঙ্গে পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কুঁচকি বা যৌনাঙ্গের আশপাশ অবশ হয়ে আসা কিংবা প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণ গুরুতর স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

এ ছাড়া আঘাতের পর তীব্র ব্যথা, জ্বরের সঙ্গে পিঠব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা বিশ্রামেও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মেরুদণ্ডের ব্যথাকে স্বাভাবিক বয়সজনিত সমস্যা ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ নির্ণয়, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad