বৈষম্যের শিকল ভেঙে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাক কন্যাশিশু

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি : এআই দিয়ে তৈরি I
কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা, অধিকার ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত। তবে বাল্যবিয়ে, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক কুসংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতার অভাব এখনো মেয়েদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে কন্যাশিশুর সম্ভাবনা বিকাশে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রতিবছর ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিবসটি উপলক্ষে কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি তার স্বপ্ন পূরণ ও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ

ইডেন মহিলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিয়া তাবাসসুম বলেন, কন্যাশিশুর জন্ম নতুন সম্ভাবনার সূচনা করলেও সমাজের কুসংস্কার, বৈষম্য ও অবহেলা অনেক সময় তার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়, আবার কোথাও বাল্যবিয়ের কারণে থেমে যায় স্বপ্নপূরণের পথ।

তাঁর মতে, উপযুক্ত শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পেলে কন্যাশিশু দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অগ্রগতি সত্ত্বেও বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও লিঙ্গবৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।

নাজিয়া তাবাসসুম বলেন, প্রতিটি কন্যাশিশু যেন নিজের স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বৈষম্য দূর করা গেলে সমতাভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

নিরাপদ শৈশবই সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি

একই বিভাগের শিক্ষার্থী মাগফেরা আখতারের মতে, একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে নিরাপদ শৈশবের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাল্যবিয়ে, হয়রানি, পুষ্টির অভাব, শিক্ষায় বৈষম্য ও সামাজিক কুসংস্কার এখনো অনেক কন্যাশিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, কন্যাশিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষার মাধ্যমে মেয়েরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

এ জন্য পরিবারকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর মতে, কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটি তার অধিকার। সুরক্ষিত শৈশবই তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ।

আজকের মেয়েরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুহা বলেন, একটি মেয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখলে সেই স্বপ্নকে নেতৃত্বে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে। তার স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, পরিবার, সমাজ ও দেশের অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখে।

তাঁর মতে, শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মেয়েরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান এবং যুক্তির মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশের দক্ষতা অর্জন করে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগের দক্ষতা, দলগত কাজ ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনাও তাদের যোগ্যতা বাড়ায়।

জুহা বলেন, মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের আগ্রহ ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। স্বপ্ন পূরণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সবার দায়িত্ব।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ জরুরি

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার বাল্যবিয়েকে সমাজের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বাল্যবিয়ে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সমস্যা প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরী ক্লাব, যুব নেটওয়ার্ক, উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। স্থানীয় মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, কাজি এবং ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরাও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

নাসরিন আক্তারের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি পরিবার ও সমাজের মানুষ সচেতন হলে কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ আরও সুরক্ষিত হবে।

শিক্ষার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা চাই

ইডেন মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আফরিদা ইসলাম বলেন, নারীশিক্ষার অগ্রগতি ঘটলেও মেয়েদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা, পেশা নির্বাচন কিংবা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক মেয়েকে পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তাঁর মতে, শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়। কিন্তু শিক্ষিত মেয়েরাও যদি নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে শিক্ষার পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।

আফরিদা ইসলাম বলেন, মেয়েদের শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ সুগম হবে।

কন্যাশিশুর স্বপ্ন পূরণে নিরাপত্তা, শিক্ষা, সমান অধিকার ও স্বাধীনতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, সম্মিলিত উদ্যোগে বৈষম্য ও বাল্যবিয়েমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে, যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশু নিজের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad