আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরা হবে। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে ড. তিতুমীরের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।
তিন সংকট মোকাবিলায় সংস্কারঅর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দেশের সমস্যাগুলো নিজস্বভাবে চিহ্নিত করা এবং বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরকারের জনগণের ম্যান্ডেটের সমন্বয় করে কাজ করা।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সম্মেলনে বাংলাদেশের মূল বার্তা থাকবে—সংস্কারগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; এগুলো নির্বাচনি ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বহুমুখী কৌশল নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে কনসেশনাল ও নন-কনসেশনাল ঋণের পাশাপাশি স্থানীয় বন্ড, সুকুক বন্ড এবং ওয়েজ আর্নার স্কিমের মতো বিভিন্ন উৎস কাজে লাগানো হবে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো অগ্রাধিকারতিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। তখন ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে যায়, জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে এবং অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেয়।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোকে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা একসময় নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন। এখন তাদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থার পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।
তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের হার ১১ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থাও ছিল অত্যন্ত খারাপ। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) অনেক বেশি ছিল। রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে এখন ব্যাংক পরিচালনায় সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
বন্ধ কারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকাবেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে অর্থ ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ে ৭ শতাংশ প্রণোদনামূলক সুদে একটি পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্সিং) স্কিম নেওয়া হয়েছে।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ কলকারখানা চালুর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল, নারী উদ্যোক্তা ও অবহেলিত অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর আশা করছে সরকার। বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন থাকা প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে সুদের হার কমাবে।
তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জিডিপি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। আগের আইএমএফ কর্মসূচিগুলো সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বন্ধ কলকারখানা চালু ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর সংস্কারগুলো চিহ্নিত করেছে। এগুলো সরকারের নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ সংস্কার কর্মসূচি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক