ঘুমের জন্যও বিলাসী আয়োজন, জনপ্রিয় হচ্ছে ‘স্লিপ ট্যুরিজম’

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ বিকাল
  • ৩০১৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, অ্যাডভেঞ্চার কিংবা বিনোদন—এ ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। পর্যটকদের একটি অংশ এখন ভ্রমণে গিয়ে খুঁজছেন নিরিবিলি পরিবেশ, গভীর ঘুম ও শরীর-মনকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘স্লিপ ট্যুরিজম’ বা ঘুমকেন্দ্রিক পর্যটন।

পর্যটকদের ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে চালু হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এতে রয়েছে পছন্দমতো বালিশ, আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ ম্যাট্রেস, ঘুমের উপযোগী তাপমাত্রা, প্রশান্তিদায়ক শব্দ ও সংগীতসহ নানা ওয়েলনেস সুবিধা।

হিলটনের ২০২৫ সালের ট্রাভেল ট্রেন্ডস রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইপসসের বৈশ্বিক জরিপে অংশ নেওয়া ইউএইর ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বিশ্রাম ও মানসিক-শারীরিক সতেজতার জন্য তারা ভ্রমণ করেন। ভ্রমণের সময় ভালো ঘুমের জন্য ৪৩ শতাংশ স্পা ও ওয়েলনেস ট্রিটমেন্ট বেছে নেন। আর ৫৭ শতাংশ এমন হোটেল পছন্দ করেন, যেখানে ঘুমের মান উন্নত করার বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

অতিরিক্ত সংযোগে ক্লান্ত মস্তিষ্ক

ঘুম বিশেষজ্ঞ ও ‘নারচার ২ স্লিপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা জুলি ম্যালনের মতে, অতিরিক্ত সংযুক্তির এই সময়ে অনেক মানুষ ছুটিতে গেলেও শারীরিক ক্লান্তির বিপরীতে তাদের মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে।

তিনি বলেন, মানুষ ইচ্ছা করলেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে না। মস্তিষ্ক যখন সতর্ক থাকার প্রয়োজন অনুভব করে না, তখনই ঘুমের সুযোগ তৈরি হয়।

ম্যালনের ভাষ্য, পর্যটকদের চাহিদাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা শুধু দৃষ্টিনন্দন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের উপযোগী হোটেল খুঁজছেন না; বরং এমন পরিবেশ চাইছেন, যেখানে প্রকৃত অর্থে বিশ্রাম নেওয়া যায়। মহামারির পর দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন তিনি।

ঘুম নিশ্চিত করতে হোটেলের বিশেষ ব্যবস্থা

ইউএইর হোটেল ও রিসোর্টগুলো ইতোমধ্যে এ প্রবণতার সঙ্গে নিজেদের সেবা যুক্ত করেছে। কোথাও অতিথিদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বালিশ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কোথাও সার্কাডিয়ান রিদম বা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

দুবাইয়ের এসআইআরও ওয়ান জায়েদেল হোটেলের ফিটনেস ডিরেক্টর অ্যালেক্স সাভা জানান, অতিথিকক্ষগুলোতে বিশেষ ম্যাট্রেস, আলো আটকানোর পর্দা এবং শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আলো ও শব্দের ব্যাঘাত কমিয়ে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রকে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।

হোটেলটির কক্ষের বাইরেও রয়েছে কনট্রাস্ট থেরাপি, ক্রায়োথেরাপি এবং শরীরের নড়াচড়া ও নমনীয়তা বাড়ানোর বিভিন্ন সেশন। সাভার মতে, অতিথিরা এখন প্রচলিত বিলাসিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শারীরিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারকেন্দ্রিক সুবিধাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

‘পিলো মেনু’ থেকে ঘুমের শব্দ

ট্রিপল বে-তে ফোর সিজনস রিসোর্ট অ্যান্ড রেসিডেন্সেস আমালায় অতিথিকক্ষে রয়েছে শতভাগ আলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। সেখানে ঘুমের জন্য ১০ ধরনের বালিশের ‘পিলো মেনু’ও রাখা হয়েছে।

রিসোর্টটির স্পা ডিরেক্টর নি কেতুত চন্দ্র জানান, সন্ধ্যায় অতিথিদের জন্য ঘুমকেন্দ্রিক বিশেষ ‘টার্নডাউন’ সেবা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শরীর ও মনকে আরামদায়ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করা হয়।

রিসোর্টটির ওয়েলনেস সুবিধার মধ্যে রয়েছে স্টিম রুম, সনা, প্লাঞ্জ পুল, ভাইটালিটি পুল, হ্যালোথেরাপি ও ক্নাইপ ওয়াক। পাশাপাশি রয়েছে ‘স্লিপ নার্চার’ রিচুয়াল, স্পা ও বিভিন্ন ওয়েলনেস কার্যক্রম। এসব আয়োজনে প্রকৃতির সংস্পর্শ, সাউন্ড হিলিং এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনও অন্তর্ভুক্ত।

দুবাইয়ের সেন্টারা মিরাজ বিচ রিসোর্টে রয়েছে ‘আর্ট অব স্লিপ’ নামে বিশেষ অভিজ্ঞতা। অতিথিদের জন্য সেখানে পিলো মেনুর পাশাপাশি শান্ত ঘুমের শব্দ ও সংগীতের ব্যবস্থা রয়েছে। রিসোর্টটির জেনারেল ম্যানেজার সামের সালেহ জানান, টিভির মাধ্যমে অতিথিরা সমুদ্রের ঢেউ, শান্ত বনের শব্দ ও হোয়াইট নয়েজের মতো প্রশান্তিদায়ক শব্দ শুনতে পারেন।

কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?

ঘুমকেন্দ্রিক এসব আয়োজনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। তবে ঘুম বিশেষজ্ঞ জুলি ম্যালনের মতে, সার্কাডিয়ান লাইটিংয়ের পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কারণ আলো মানুষের জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান সংকেত। ঘরের তাপমাত্রাও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে এবং অতিরিক্ত উষ্ণতা ঘুমে বারবার ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

ফোর সিজনস আমালার স্পা ডিরেক্টর চন্দ্র জানান, তাদের অনেক ওয়েলনেস সুবিধা ওয়াইল্ডস্মিথ স্কিন অ্যান্ড ওয়েলবিইংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়েছে। এতে থেরাপিস্ট, মুভমেন্ট বিশেষজ্ঞ ও ওয়েলবিইং পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে।

এসআইআরওর অ্যালেক্স সাভাও জানান, তাদের কার্যক্রমের ভিত্তি ঘুমবিষয়ক বিজ্ঞান। ফিটনেস, রিকভারি, পুষ্টি ও ওয়েলনেসের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে তারা বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণের চেষ্টা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দিনে ঘুমকে শুধু বিলাসী হোটেল সুবিধা হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক ওয়েলনেসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হবে। ঘুমের পাশাপাশি পুষ্টি, শরীরচর্চা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সার্কাডিয়ান স্বাস্থ্যের সমন্বিত ব্যবস্থাও পর্যটনশিল্পে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad