সার সংকট ও ডিলার নিয়োগে নৈরাজ্য

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৫ দুপুর
  • ২৬৭০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
সার ব্যবস্থাপনার ভুল নীতি, বারবার ডিলার নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন এবং দলীয়করণে দেশের কৃষি খাতে গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সার মজুতের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে নৈরাজ্য থামছেই না। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সার সংকট চরমে পৌঁছেছে। এর জেরে গুদাম ভাঙচুর করে লুট এবং অপ্রীতিকর ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ভুল নীতি এবং নতুন ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টার কারণেই মূলত এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে

২০০৯ সালের সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নে মূল ডিলার একজন এবং তার অধীনে ৯ জন খুচরা বিক্রেতা থাকার বিধান ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে একটি ইউনিয়নে তিনজন ডিলারের অধীনে প্রতিজনের বিপরীতে দুজন করে খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরে এক ইউনিয়নে তিনজন ডিলার দেওয়া হয়। তাদের অধীনে তারা পছন্দের দুজন ডিলার নিয়োগ করতে পারবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কৃষিবিদ ড. মনিরুজ্জামানের মতে, সরকারের এই নীতিটি সম্পূর্ণ ভুল এবং ফলে বাজারে মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা তৈরি হবে। তিনি বলেন, সার সংকট না থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা চলছে। এর পরিবর্তে ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে একজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলে তারা নিজেদের ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষার্থে সংকটের সুযোগ নিত না এবং নামমাত্র মুনাফায় সার বিক্রি করত।

দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠিত ডিলারদের বাদ দেওয়ায় এবং তাদের স্থলে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট নতুন মুখ আসায় সার নিয়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, দেশে পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং আগামী বোরো মৌসুম শুরুর আগে অর্থাৎ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারের কোনো ঘাটতি হবে না। বোরো মৌসুমের জন্য ইতোমধ্যে সাতটি লটে বিদেশ থেকে আগাম সার আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট কৃষি সচিব মো. সেলিম খানও জানিয়েছিলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে।

অন্যদিকে মাঠের চিত্র ভিন্ন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে হাজার হাজার কৃষক লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পাননি। একজন ডিলার ৫৬০ বস্তা সার বিতরণ করলেও চাহিদা প্রায় ৫,০০০ বস্তা বলে স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্যে উঠে আসে। কুড়িগ্রামে সার না পাওয়ার অভিযোগে ২০ সেপ্টেম্বর কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে।

তবে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) দাবি, মাঠে কৃষকের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে এবং পুরোনো নীতি মেনে সার বণ্টনের ফলেই সংকট দেখা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সার ব্যবস্থাপনা) আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে সারের কোনো প্রধান মৌসুম না থাকলেও কৃষকদের মধ্যে একধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। গত পাঁচ বছরের তুলনায় উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় এখন বরং অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের সরকারি গুদামে এক মাসের বেশি সার রাখার সুযোগ না থাকায় এই কৃত্রিম উত্তেজনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

বিএফএর আপত্তি

নতুন ডিলার নিয়োগের মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর বিএফএ নীতিমালা-২০২৬-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে অস্পষ্টতা দূর না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি ডিলারদের বস্তাপ্রতি বিক্রয় কমিশন ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার দাবিও জানিয়েছে। তাদের দাবি, নতুন কাঠামোতে বিদ্যমান ডিলারদের মর্যাদা, ডিলার ইউনিট, সংখ্যা ও দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, কৃষকের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে সার পৌঁছানো এবং অনিয়ম বন্ধ করাই নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে ডিলারশিপ বাতিলের বিধানও রয়েছে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন—সমস্যা কি সারের মোট মজুতে, নাকি বরাদ্দ ও মাঠপর্যায়ের বিতরণ ব্যবস্থায়? তিন দফায় ডিলার কাঠামো বদলানোর পরও যদি কৃষককে সার পেতে ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করতে হয়, তাহলে নীতিমালার কাঠামোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি, বরাদ্দের হিসাব এবং ডিলার বাছাই প্রক্রিয়াও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে জানিয়েছে কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

মোবাইল কোর্ট ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা

সার ডিলার ও ব্যবসায়ীদের অনিয়ম-দুর্নীতি কঠোর হাতে দমনের অংশ হিসেবে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি মাঠপর্যায়ে অভিযান চালাচ্ছে। আগস্টে সারা দেশে ২০৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৩৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৩টি মামলা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩৮টি অভিযানে ২২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা এবং পাঁচটি মামলা করা হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে মাগুরা সদরের ‘মেসার্স শেখ এন্টারপ্রাইজ’ ও ঝিনাইদহের শৈলকূপার ‘মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজ’-এর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ স্থগিত করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম, বগুড়া, জয়পুরহাট ও খুলনার বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও লাইসেন্স বাতিল বা কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। সার বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও কৃষক ভোগান্তির জেরে কুড়িগ্রামের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ঝিনাইদহে বদলি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক চাপ ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

নতুন ডিলার নিয়োগ ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ে নতুন ডিলার নিয়োগের মাঠপর্যায়ের তালিকাও পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগের বিষয়ে মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহা. আজম উদ্দিন প্রকাশ্যে এমন কোনো চাপ অনুভব করেননি বলে জানিয়েছেন।

চুয়াডাঙ্গায় ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়ার খবরও এসেছে। অর্থাৎ প্রতি ডিলারশিপে গড়ে ১৪ জন আবেদনকারী রয়েছেন। আবেদনকারীদের বড় অংশ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী—এমন দাবিও সংবাদে এসেছে।

ডিলার নিয়োগে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ বিষয়ে ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের সভাপতি মো. জিয়াউল হায়দার পলাশ আমার দেশকে বলেন, সারের অধিকাংশ ডিলার এখনো বিগত সরকারের আমলের এবং তারা বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও যদি দলীয়করণ করা হয় এবং অ-ব্যবসায়ীদের ডিলার করা হয়, তবে সরকার তার সুফল পাবে না।

তিনি বর্তমান সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে জরুরিভিত্তিতে জোনভিত্তিক ন্যূনতম দুই থেকে তিন মাসের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘বাফার স্টক’ স্থাপনের সুপারিশ করেছেন।

কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, সরকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকি করছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।

শিগগিরই নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হবে। তবে মাঠপর্যায়ে চলমান এই বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব কত দ্রুত দূর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad