কাশফুল দেখে মুনিয়ার মনে যেন আনন্দের ঢেউ উঠল। সন্ধ্যার একটু আগে ভাই মুরাদ বাড়ি ফিরতেই সে ছুটে গিয়ে ভাইয়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘জানো ভাইয়া, আমাদের বাগানে কাশফুল ফুটেছে।’
বিষয়টি মুরাদের জানা থাকলেও বোনের আনন্দে পানি ঢালতে চাইল না। উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘সত্যি! খুব সাদা ফুল, তাই না?’
মুনিয়া আরও আনন্দ নিয়ে বলল, ‘একেবারে দুধসাদা!’
বইয়ের ব্যাগ রেখেই মুরাদ বোনের সঙ্গে বাগানে ছুটে গেল। সেখানে দেখা গেল, তিন গোছা কাশফুল ফুটেছে। প্রতিটি গোছায় চার-পাঁচটি করে ফুল।
ফুলগুলোর মাঝখানে উড়ে বেড়াচ্ছিল একটি টুনটুনি পাখি। ভাই-বোনকে দেখে পাশের ডুমুরি গাছের বাসায় গিয়ে বসল পাখিটি। মুনিয়া ইশারায় তাকে অভয় দিল। পাখিটিও যেন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ভাই-বোনের আনন্দ দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাগানে এসে দাঁড়ালেন আম্মু ও দাদুভাই। তাঁদের চোখেমুখেও আনন্দ। সন্তানদের উচ্ছ্বাস দেখতে দেখতে যেন তাঁরাও ফিরে গেলেন নিজেদের শৈশবের দিনগুলোতে।
দাদুকে কাছে পেয়ে মুনিয়ার প্রশ্নের ঝুলি খুলে গেল। সে জানতে চাইল, ‘দাদু, কাশফুল সারা বছর ফোটে না কেন?’
দাদুভাই মৃদু হেসে বললেন, কাশফুল ছোটদিনের উদ্ভিদ। অর্থাৎ দিনের দৈর্ঘ্য কমে এবং রাতের দৈর্ঘ্য বাড়লে এর ফুল ফোটার হরমোন সক্রিয় হয়। বাংলাদেশে সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে কাশফুল দেখা যায়। বর্ষার পর শরতের শুরুতে, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে তাই মাঠ-ঘাট ও নদীর তীরে কাশফুলের সৌন্দর্য চোখে পড়ে।
বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিতে কাশগাছ পর্যাপ্ত পানি পেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে। পরে শরতের শুরুতে মাটিতে থাকা আর্দ্রতা ফুল ফোটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, কাশগাছের কিছু ঔষধি ব্যবহারের কথাও প্রচলিত আছে। দাদুভাই জানান, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় কাশগাছের মূল বা শিকড় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। মূত্রবর্ধক হিসেবে, প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, মূত্রনালির সংক্রমণ ও প্রস্রাব পরিষ্কারের ক্ষেত্রে এর মূল ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া শরীরের অতিরিক্ত ঘাম ও দুর্গন্ধ কমাতে, ব্যথা ও ফোড়ার চিকিৎসা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং পাইলসের সমস্যায়ও এর ব্যবহারের কথা বলা হয়।
দাদুর কথা শুনে মুনিয়া ও মুরাদ দুজনেরই চোখ বড় হয়ে গেল। কাশফুলের এত বৈচিত্র্যময় দিক যে আছে, তা তারা আগে জানত না।
হঠাৎ মুনিয়ার মনে পড়ল দাদুভাইয়ের তরফ নওয়াপাড়ার মাঠের জমির কথা। সে আবদারের সুরে বলল, ‘দাদুভাই, তোমার ওই জমিতে নিশ্চয়ই অনেক কাশফুল ফুটেছে। আমাদের নিয়ে যাবে?’
মুনিয়া সমর্থনের আশায় ভাইয়ের দিকে তাকাল। মুরাদও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
দাদুভাই বললেন, ‘আগামীকাল শুক্রবার। তোমাদের স্কুল বন্ধ। আমরা কালই যাব, ইনশাআল্লাহ।’
কথাটি শুনেই মুনিয়ার মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। খোলা মাঠে গিয়ে হাত দিয়ে তুলার মতো নরম কাশফুল ছুঁয়ে দেখবে সে। ফুলের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো মৌমাছি, ঘাসফড়িং, প্রজাপতি ও নানা রঙের পোকামাকড়ও দেখবে। ভাবতেই তার আনন্দ হচ্ছিল।
মুরাদেরও বেশ ভালো লাগছিল। অনেক দিন পরিবারের সঙ্গে খোলা প্রকৃতির মধ্যে যাওয়া হয়নি। পরদিন পুরো পরিবারই গেল কাশফুল দেখতে।
সারাদিন মাঠে ঘুরে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে আনন্দে কাটল সবার সময়। ফেরার সময় মুনিয়া ও মুরাদ দুহাতভর্তি কাশফুল নিয়ে ফিরল।
শরতের সাদা কাশফুল শুধু তাদের বাগানটাকেই সুন্দর করেনি, পরিবারের সবার মনে ফিরিয়ে এনেছে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার নির্মল আনন্দও।
তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬; লেখক: জুবায়ের হুসাইন।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স