খেলাপি ঋণ কমাতে পুরোনো শ্রেণিকরণ নীতিতে ফেরার ভাবনা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ দুপুর
  • ৫৩৩৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
নানা ধরনের ছাড় দিয়েও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে আবারও পুরোনো নীতিতে ফেরার কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মেয়াদি ঋণ (টার্ম লোন) খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণের সময়সীমা বর্তমান তিন মাস থেকে আরও ছয় মাস বাড়ানোর পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এতে কোনো মেয়াদি ঋণ নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধের পর মোট নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার পর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হবে।

বর্তমানে কোনো ঋণের নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধের সময় পার হওয়ার পরদিন থেকেই সেটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে ধরা হয়। এরপর ৯০ দিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে তা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়।

গত ২৭ আগস্ট সরকারি ও বেসরকারি পাঁচ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এ ধরনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, ন্যাশনাল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর মতামতও জানতে চান।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় গভর্নর সাময়িকভাবে আগের নীতিমালায় ফেরার সম্ভাবনার কথা বলেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। এ সময় রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল হুদা সাময়িকভাবে আগের নীতিতে ফেরার পক্ষে মত দেন। অন্যরা কোনো মতামত দেননি।

২০১৯ সালে শিথিল করা হয়েছিল নীতি

২০১৯ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা পরিবর্তন করে খেলাপি ঋণ নির্ধারণের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। তখন ঋণকে ‘নিম্নমান’, ‘সন্দেহজনক’ এবং ‘মন্দ বা কুঋণ’ হিসেবে শ্রেণিকরণের প্রতিটি ধাপের সময়সীমা তিন মাস করে বাড়ানো হয়।

ওই নীতিতে কোনো ঋণ অপরিশোধিত থাকার ৯০ দিন পর সেটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ধরা হতো। এরপর আরও ২৭০ দিন পার হলে তা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হতো। ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার কমে আসে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৯ সালের মার্চে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই বছরের এপ্রিলে নীতিমালা শিথিল করার পর জুনে খেলাপি ঋণের হার কমে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশে নামে। সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা ছিল যথাক্রমে ১১ দশমিক ৯৯ ও ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০২০ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের হার আরও কমে ৯ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসে।

কঠোর নীতিতে বেড়েছে প্রকৃত খেলাপি ঋণ

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের গোপন খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত কিস্তির সময় পার হওয়ার পরদিন থেকেই ঋণকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর ৯০ দিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলেই সেটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং বাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন নীতিমালা কার্যকরের পর ২০২৫ সালের জুনে প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ডিসেম্বর প্রান্তিকে কিছুটা কমে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।

তবে বিশেষ সুবিধা নেওয়া কিছু ঋণগ্রহীতা পরবর্তী সময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা হয়। জুন শেষে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

৬-৭ শতাংশ কমতে পারে খেলাপি ঋণের হার

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের নীতিমালায় ফিরলে কাগজে-কলমে ব্যাংক খাতের বর্তমান খেলাপি ঋণের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মেয়াদি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই মেয়াদি ঋণ।

তবে নতুন করে শ্রেণিকরণের সময়সীমা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিবর্তে ব্যাংক খাত আবারও তুলনামূলক শিথিল ব্যবস্থায় ফিরে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা পরে হিসাবের খাতায় প্রতিফলিত হবে।

ব্যাংকারদের মতে, অতীতেও খেলাপি ঋণ কম দেখাতে এ ধরনের নীতি নেওয়া হয়েছিল। এতে প্রকৃত সমস্যার সমাধান না হয়ে খেলাপি ঋণ আড়াল হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি গ্রাহকদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়েছে। আবারও একই ধরনের নীতি নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নীতিমালা পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণ কম দেখানো সম্ভব হলেও এতে ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না। এটি অনেকটা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরে রেখে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার মতো। দেশের ভেতরে খেলাপি ঋণের হিসাব কম দেখানো গেলেও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিদেশি ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করবে। ফলে এতে বাস্তবে কোনো সুফল মিলবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এ ধরনের কোনো নীতিমালা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্নভাবে কাজ করছে। তাঁর ভাষায়, খেলাপি ঋণ ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ করে বা ‘কার্পেটের নিচে লুকিয়ে’ কমানো হবে না।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad