সিরাজগঞ্জে যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, কর-ভ্যাট ফাঁকি এবং আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বালু সাত্তার’-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যমুনার বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সাত্তার বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও কর্মী নিয়ন্ত্রণ করেন। তার প্রভাব সিরাজগঞ্জ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলাতেও বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, একসময় শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত সাত্তার সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু সময় আত্মগোপনে থাকার পর তিনি ফের প্রকাশ্যে সক্রিয় হন। বর্তমানে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
যমুনা থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন বালুমহালের ইজারা নেওয়ার পাশাপাশি ইজারার নির্ধারিত এলাকার বাইরেও যমুনা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব কাজে বিপুলসংখ্যক বাল্কহেড ও বালুবাহী ট্রাক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালি ও শাহজাদপুরের বিভিন্ন এলাকায় যমুনার ভাঙনে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া বালুবাহী ট্রাকের অতিরিক্ত চলাচলে জানপুর, রানিগ্রাম, হোসেনপুর ও নিউ ঢাকা রোডসহ শহরের কয়েকটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যাওয়ার আগেই বালু উত্তোলনকারীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। ফলে পরিদর্শনের সময় অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া যায় না।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইজারা দেওয়া এলাকার বাইরে কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট স্থান ও তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “আমি এখনো যমুনার কোথাও বালু উত্তোলন হতে দেখিনি। শহরের রাস্তা বা কোনো স্থাপনার ওপর দিয়ে বালুবাহী ট্রাক চলাচলের বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই।”
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, বালু সাত্তার অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে তাদের দাবি।
বৃক্ষরোপণ, শহর পরিচ্ছন্নতা ও দরিদ্রদের সহায়তার মতো বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি মেয়র পদে নিজের সম্ভাব্য প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন বলেও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন একজন ব্যক্তির স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ে দলটির ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বালু সাত্তারকে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, জেলা চেম্বারের পরিচয় এবং বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার সুপারিশের মাধ্যমে তিনি ওই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
কর-ভ্যাট নিয়েও প্রশ্ন
সাত্তারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও সম্পদের বিপরীতে পরিশোধ করা ভ্যাট ও আয়কর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, রিসোর্ট, ডকইয়ার্ড, গাড়ি, বাড়ি ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও তার প্রদত্ত কর ও ভ্যাটের পরিমাণ আয়ের তুলনায় কম।
তবে কর ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
বালু উত্তোলন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনে প্রভাব, কর-ভ্যাট ফাঁকি এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বালু সাত্তারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনা করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তথ্য সুত্র: ডেইলি স্কাই

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক