সংস্কার ও জনস্বার্থের দাবিতে রাজপথে নামছে ১১ দলীয় ঐক্য

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৪ দুপুর
  • ১৫৪৯৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
বর্তমান সরকারের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সংবিধান সংস্কারে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছে জোটটি।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের মধ্য দিয়ে দাবি আদায়ের আন্দোলন জোরদার করতে চায় ১১ দলীয় ঐক্য। বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী দল হিসেবে এটিই জোটটির প্রথম বড় কর্মসূচি। পর্যায়ক্রমে আরও তিন বিভাগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখান থেকে সরকারকে দাবি আদায়ের বিষয়ে চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হবে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে।

জোট নেতারা বলছেন, সংসদের পাশাপাশি গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ, প্রচার ও বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণে রাজপথের কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ জনগুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দাবিও যুক্ত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতেও দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদেও বিরোধী দলের ভূমিকা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, সংসদের ভেতরে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা সোচ্চার ছিলেন। পাশাপাশি সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সরকারকে গণরায় দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত না করায় লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও ফয়সালা করা সম্ভব, সেগুলো রাজপথে ঠেলে না দেওয়ার জন্য সরকারকে বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করায় পরিস্থিতি রাজপথে এসেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্ট বৈষম্যের প্রতিবাদেও লংমার্চের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।

চার বিভাগে লংমার্চ, এরপর মহাসমাবেশ

জোট সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গত ৬ আগস্ট রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ১১ দলীয় ঐক্য। সেখান থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকায় মহাসমাবেশসহ চার বিভাগে লংমার্চের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই দিন সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রাজপথের কর্মসূচি জোরদারের বার্তাও দেন।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে লংমার্চ করার কথা রয়েছে। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংস্কারের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদে বারবার বলা হলেও সরকার কোনো সাড়া দেয়নি। তাই জনগণের দাবি জনগণের কাছেই নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুও রয়েছে।

তিনি বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে এবং দাবি-দাওয়ার পক্ষে জনমত আরও বাড়বে। কর্মসূচিতে ব্যাপক অংশগ্রহণের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

শাপলা চত্বর থেকে শুরু, শেষ লালদীঘিতে

১১ দলীয় ঐক্যের প্রথম বড় কর্মসূচি ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। রাজধানীর ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরে সকাল ৭টায় সমাবেশের পর লংমার্চ শুরু হওয়ার কথা। রাত ৯টায় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।

পথে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ, কুমিল্লার পদুয়ারবাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বড় পথসভা হবে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি স্থানে ছোট পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন।

লংমার্চ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠক করেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। একই সঙ্গে লংমার্চের রুট-সংশ্লিষ্ট এলাকার দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে জামায়াত। কর্মসূচি সফল করতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারাও দফায় দফায় বৈঠক করছেন। আজ ৩১ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে কর্মসূচির বিস্তারিত প্রস্তুতি তুলে ধরার কথা রয়েছে জোট নেতাদের।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ ১১ দলীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রথম কর্মসূচি। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ প্রধান ছয় দাবিতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এটি সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। কর্মসূচি সফল করতে সরকার, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা এবং দেশবাসীর দোয়া কামনা করেন তিনি।

ছয় দফা দাবিতে কর্মসূচি

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের ডাকে গণদাবি আদায়ের লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে তিন দফা কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ, গোলটেবিল আলোচনা ও প্রচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। চতুর্থ ধাপে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

লংমার্চের ছয়টি প্রধান দাবি হলো—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও দেশব্যাপী সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

তিনি জানান, লংমার্চে ছয় থেকে সাতটি স্থানে শীর্ষ নেতারা পথসভা করবেন। এতে এক হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত থাকবে। পথে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন যানবাহনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লংমার্চের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে অভ্যর্থনা, মেডিকেল, পরিবহন, প্রচার ও প্রকাশনা, আইটি, স্বেচ্ছাসেবক, সাংস্কৃতিক, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ—এসব বিভাগে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডাবল রোডের একটি পথ লংমার্চের জন্য ব্যবহার করা হবে এবং অপর পথটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য খোলা রাখা হবে। তবে বিশাল গাড়িবহর ও পথসভার কারণে সাময়িক যানজট বা ভোগান্তি হতে পারে উল্লেখ করে এ জন্য দেশবাসীর কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

সংসদেও সোচ্চার হবে বিরোধী দল

লংমার্চের কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, নির্বাচনে জয়লাভের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গণভোটের গণরায় অস্বীকার করছে। তাদের দাবি, সরকার গণরায়কে সংবিধানবিরোধী বলে অভিহিত করছে এবং রাষ্ট্রপতির আদেশকে চ্যালেঞ্জ করছে। সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও ১১ দলের এমপিরা নোটিশ দিয়ে বারবার এ বিষয়ে আলোচনা করলেও তা নিষ্ফল হয়েছে। সংসদে এর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ৭০ শতাংশ জনগণের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় সমুন্নত রাখতে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

এদিকে সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে লংমার্চ শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগেও কর্মসূচি নেওয়া হবে। পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

জানা গেছে, লংমার্চে ঢাকা থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের গাড়িবহরের পাশাপাশি পথে পথে স্থানীয় নেতাকর্মীরাও যোগ দেবেন। জোটের প্রতিটি দল থেকে সর্বাধিকসংখ্যক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের নির্দেশনার বাইরেও সব দল থেকে ব্যাপক অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখা গেছে। সব মিলিয়ে এটি ঐতিহাসিক লংমার্চ হবে এবং ১১ দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকবে বলে আশা করছেন তারা।

সংসদেও বাড়ছে প্রতিবাদ

জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় সংসদেও আরও সোচ্চার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ।

প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদলীয় দুই এমপির প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ ও ‘পল্টনের বক্তৃতা’র সঙ্গে তুলনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে বিরোধী দল অবস্থান নেয়। এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে তোলার আগে আপত্তি জানিয়ে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুবার ওয়াকআউটের পরিস্থিতি তৈরি হলেও তারা সংসদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষদিকে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাসের চেষ্টা করলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ওয়াকআউট করেন।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো বিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাসের চেষ্টা করা হলে বিরোধী দল প্রতিবাদ করবে। একই সঙ্গে গণভোট বাস্তবায়নের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad