বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৬ দুপুর
  • ১৩৪৫৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত ক্ষমতাবানই হোক, তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস এমন একটি দিন, যা দেশের মানুষকে গভীর বেদনা ও হাহাকারের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বছরের পর বছর সন্তান ও স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন এবং স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনযাপন করা স্ত্রীদের কষ্টের কথা স্মরণ করতে হবে। অনেক সন্তানের শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়; কিন্তু সেই বাবা আর ফিরে আসেননি।

তিনি বলেন, ‘গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।’ গুমের কারণে শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যান না, এর সঙ্গে একটি পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্বও বিপর্যস্ত হয়। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়।

গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে’ গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহতা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল। যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেছেন, তাদের অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অপরাধ অস্বীকার করে গেছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অসংখ্য মানুষের কথা উল্লেখ করেন। তাদের পরিবারের সদস্যদের বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার ও দুঃসহ পরিবেশে ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং তারা আর ফিরে আসেননি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছেন, স্বাধীন দেশে গুম ও নির্যাতনের সংস্কৃতি সেই আদর্শের পরিপন্থী। এর মাধ্যমে দেশে ভয় ও ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসের এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। খালেদা জিয়া বিশ্বাস করতেন, একদিন বাংলাদেশেই এসব গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ‘ফ্যাসিবাদ’ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টি স্পষ্ট করে।

রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। এসব পরিবারের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয় থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছেন—সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের মানদণ্ড।

সবশেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’

তিনি আরও বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশে ‘ফ্যাসিবাদ’ ফিরে আসার সব পথ বন্ধ করার কথাও জানান তিনি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্র আন্তরিকভাবে দাঁড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad