তালায় উন্নয়নের টাকায় লুটপাটের অভিযোগ, কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনের বিস্তর অনিয়ম

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৪ সকাল
  • ১৬৮৪২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর (টেস্ট রিলিফ) ও কাবিটা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে কিংবা কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের বিল ছাড়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয়ের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টিআর প্রথম পর্যায়ে মাদরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পরিতোষের বাড়ি এবং শালিখা খেয়াঘাটমুখী ইটের রাস্তা সংস্কারে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইউপি সদস্য প্রবীর মণ্ডল মাত্র দুই হাজার ইট বসিয়ে পুরোনো রাস্তার ওপর সামান্য বালু ছিটিয়ে পুরো বরাদ্দের অর্থ তুলে নিয়েছেন।

একইভাবে কাবিটা প্রথম পর্যায়ে মাদরা শ্মশানঘাটে মাটি ভরাটের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও অর্ধেক কাজ করে পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে ইউপি সদস্য নমিতা মণ্ডলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, বিল ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয়কে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়েছে।

এদিকে মাগুরা শ্মশানঘাটে মাটি ভরাটের জন্য ৫ দশমিক ৫০০ টন চাল বরাদ্দ পেলেও ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম নামমাত্র কাজ করে পুরো বরাদ্দ তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। কাবিটার দ্বিতীয় পর্যায়ে মাগুরা ক্ষত্রীয়পাড়া থেকে জিতেনের বটতলা পর্যন্ত মাটি দিয়ে রাস্তা সংস্কারের ২ লাখ টাকার প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, মাগুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা উত্তম সেন বাবুলাল নিজের প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক দুলাল চন্দ্র বাছাড়কে সভাপতি করে কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একইভাবে জান্নাতুল ফেরদৌস জামে মসজিদের নামে ২ লাখ টাকার প্রকল্পেও নামমাত্র কাজ করে পুরো অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।

টিআর দ্বিতীয় পর্যায়ে মাগুরাডাঙ্গা থেকে মাদরা গেট পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গনেষ দেবনাথ খালের সামান্য অংশ পরিষ্কার করে পুরো বিল উত্তোলন করেছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান, পাঁচ দিন ধরে ৯০ জন শ্রমিক কাজ করেছেন এবং প্রতিদিন তাদের ৩৫০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের প্রতিটি বিল ছাড় করতে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। প্রকল্প পরিমাপ, পরিদর্শন ও ফাইল প্রক্রিয়াকরণের নামে আলাদাভাবে অর্থ নেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে কয়েকজন নির্দিষ্ট জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ ভাগাভাগিরও অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক অফিস সহকারী সোহেলের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে উত্তম সেন বাবুলাল বলেন, “প্রতিবন্ধী স্কুল ও মসজিদ—দুটি প্রকল্পই আমার। অফিসের কিছু হিসাব-নিকাশ থাকে, তাই শতভাগ কাজ করা সম্ভব হয় না।”

অন্যদিকে ইউপি চেয়ারম্যান গনেষ দেবনাথ বলেন, “খালে কাজের পরিবেশ অনুকূলে ছিল না। মেশিন ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি, তাই শ্রমিক দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।”

এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাটকেলঘাটা ইউনিয়নের উত্তর শার্শা এলাকায় ইটের সলিংয়ের জন্য গম বরাদ্দ থাকলেও কাজ হয়েছে খুবই সামান্য। নগরঘাটা ইউনিয়নের সুমনডাঙ্গা মনসা মন্দির নির্মাণে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার প্রকল্পে মাত্র ৫০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ। সরুলিয়া ইউনিয়নের জুসখোলা এলাকায় ইটের সলিংয়ের ২ লাখ টাকার প্রকল্পেও দায়সারা কাজ হয়েছে।

তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের দেওয়ানীপাড়া বাজার থেকে ওহাবের বাড়ি পর্যন্ত ইটের রাস্তার জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রথমে কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়। পরে স্থানীয়দের অভিযোগের পর পুনরায় রাস্তার সংস্কার করা হয়েছে। ইউপি সদস্য মশিয়ার রহমান বলেন, “আগে টাকা তোলা হয়েছিল, পরে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।”

খেশরা ইউনিয়নের মুরাগাছা মন্দির সংস্কারের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও যথাযথ কাজ না করেই পুরো অর্থ ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আশরাফ হোসেন বলেন, “জুন ক্লোজিংয়ের কারণে বিল দেওয়া হয়েছে। তবে কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্প তদারকিতে রয়েছে। কোথাও নিম্নমানের কাজ হলে পুনরায় কাজ করতে হবে।”

তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, “টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ বলেন, “প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad