২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এ সময়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি বদলে গেছে নারায়ণগঞ্জের ক্ষমতার চিত্রও। তবে শহরবাসীর স্মৃতিতে এখনো দগদগে হয়ে আছে ১৯ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত বিকাল, যেদিন তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনায় অভিযুক্ত অস্ত্রধারীদের কাউকেই এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক পতনের সূচনা হয়েছিল ওই জুলাই আন্দোলনের সময়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। সেদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া নূর মসজিদ, ডিআইটি মসজিদসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিল বের হওয়ার কথা ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজের আগেই বঙ্গবন্ধু সড়কের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভেতর ও নির্মাণাধীন ভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে উপস্থিত হন শামীম ওসমান এবং তার ছেলে অয়ন ওসমান।
এদিকে ডিআইটি এলাকা ও চাষাঢ়া থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল এগিয়ে আসতেই নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভেতর থেকে হামলা শুরু হয়। এতে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং মুহূর্তেই পুরো এলাকা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, সেদিন শামীম ওসমানের সঙ্গে তার ছেলে অয়ন ওসমান, শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, বেয়াই সালাউদ্দিন লাভলু, অয়নের শ্যালক ভিকি, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাদের হাতে পিস্তল, শটগান ও অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ছিল। একপর্যায়ে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ডিআইটি এলাকার দিকে অগ্রসর হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতেও শামীম ওসমানকে অস্ত্র হাতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। চাষাঢ়া, ডিআইটি ও পরে জালকুড়ি এলাকায়ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে।
আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের অভিযোগ, ওই সময় শহরের রাইফেল ক্লাব থেকে লুট করা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে আলী আহমেদ চুনকা পাঠাগারের সামনে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়লে সেখানে সশস্ত্র দল নিয়ে এগিয়ে যান শামীম ওসমান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় তাকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে দেখা যায়।
বিকেলের দিকে জালকুড়ি এলাকায় আবারও ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন গলিতে ঢুকে শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমান আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তুললে তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা পাসপোর্ট অফিসে আশ্রয় নিয়েছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে উত্তেজিত জনতা হামলা চালায়। একপর্যায়ে পাসপোর্ট অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী ও ফটোগ্রাফার পারভেজ আসিফ আহমেদ উৎস বলেন, ডিআইটি থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল ২ নম্বর রেলগেটের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভেতর থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। অন্তত ছয়জনের হাতে পিস্তল ছিল। ছবি তুলতে দেখে তাকে লক্ষ্য করেও তিন রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়, যা পাশের একটি গাছের ডালে গিয়ে লাগে।
তিনি আরও বলেন, চারদিক থেকে গুলির শব্দে সেখানে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে অটোরিকশায় সরে যাওয়ার সময়ও তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছিল।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আহমেদুর রহমান তনু বলেন, ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ১৯ জুলাইয়ের ঘটনায় তারা উপলব্ধি করেন, আন্দোলন দমাতে কতটা সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তার ভাষায়, ওই সময় রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবাই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন।
দিনভর সংঘর্ষের পর সন্ধ্যার দিকে শামীম ওসমান ও তার সশস্ত্র অনুসারীরা পিছু হটতে শুরু করেন। ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে তারা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত চাষাঢ়া এলাকায় তাদের অস্ত্র হাতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে শামীম ওসমানসহ ওসমান পরিবারের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার