দুবাইয়ে আটক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো বিস্তৃত নথিপত্রের পরও দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
জানা গেছে, গত ১২ জুন দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল শাখা বাংলাদেশ পুলিশকে চিঠি দিয়ে বেনজীর আহমেদের আটকের বিষয়টি জানায়। এরপর ১৯ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাকে দেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে ২৪৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নথিপত্র দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
নথিতে বেনজীর আহমেদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছয়টি মামলার নথি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া অভিযোগ, গুম, অর্থপাচার, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বিভিন্ন আদালতের আদেশ এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত চলাকালে দেশত্যাগের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ১৭টি, দুদকের ছয়টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিনটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্যও নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন, এসব তথ্য পাওয়ার পর দুবাই কর্তৃপক্ষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে নথি পাঠানোর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন প্রত্যর্পণের পরবর্তী প্রক্রিয়া সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক পর্যায়েও জোর প্রচেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাইয়ে তাকে আটক করা হয়েছে। সে বিষয়টি দুবাই কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে দ্রুত প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশগামী একটি ফ্লাইটে ওঠার আগে নিয়মিত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের পরিচয় শনাক্ত হয়। পরে ইন্টারপোলের সতর্কতা সংকেত যাচাই করে দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে।
তবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় কয়েকটি জটিলতা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, দুবাইয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে—এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দেশটি সাধারণত অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। বিশেষ করে অভিযোগ যদি মূলত অর্থপাচার বা আর্থিক অপরাধকেন্দ্রিক হয় এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার এখনো চূড়ান্ত না হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ আরও জটিল হয়ে পড়ে।
এদিকে একাধিক সূত্রের দাবি, দুবাইয়ে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যবসায়ী বেনজীর আহমেদের মুক্তির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন। এমনকি তার পক্ষে দুবাই পুলিশের কাছে আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নজরদারিতে রেখে প্রয়োজন হলে দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে আরও তথ্য পাঠানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে বাংলাদেশ সরকার।
অন্যদিকে, আরেকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বেনজীর আহমেদকে আইনের আওতায় রাখতে সক্রিয় রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অতীতে একটি আলোচিত ঘটনার জেরে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে তার বিরোধ ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা র্যাবের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে তার নামও ছিল।
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি দেশ ত্যাগ করে দুবাইয়ে যান বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। পরবর্তীতে তিনি দুবাইয়ের পাশাপাশি তুরস্ক, স্পেন ও মরক্কোতেও অবস্থান করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বেনজীর আহমেদ ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবসরের পর তিনি বেসরকারি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
বর্তমানে তার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার দিকে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে নজর রাখা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত দুবাই কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক