জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে বিপর্যস্ত শিল্পখাত, বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ জুন ২০২৬, ১০:৪০ দুপুর
  • ২৪২৩৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

উৎপাদন কমেছে বহু শিল্পে, বিনিয়োগে স্থবিরতা; রপ্তানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে দেশের শিল্পখাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ কারখানা লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ঘাটতি বর্তমানে শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় সংকট। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে নেমে এসেছে। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকেরও কমে গেছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ওয়েভিং টেক্সটাইল, জুট টেক্সটাইল, ওষুধ, সিমেন্ট, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, আয়রন ও স্টিলসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও একই ধরনের সংকট বিরাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধির ফলে শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। কিন্তু সেই অর্থ শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না।

এদিকে দেশের ইস্পাত ও নির্মাণসামগ্রী শিল্পও কঠিন সময় পার করছে। অবকাঠামো খাতে মন্দা, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। শিল্প মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, কর ও শুল্কজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশ বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতেও সম্ভাবনার তুলনায় অগ্রগতি সীমিত। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের অকার্যকারিতা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি এ খাত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দ্রুত শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ডলারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

তাদের মতে, শিল্পখাতের এই স্থবিরতা কেবল উৎপাদন ও রপ্তানির সংকট নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad