যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ জন বন্দির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব বন্দিকে প্যারোল বা শর্তসাপেক্ষ মুক্তির সুযোগ ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা কমানোর ঘটনা এটিই প্রথম।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) এ ঘোষণা দেন গভর্নর নিউসম। মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতা, তা কার্যকরের বিপুল ব্যয় এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুলের আশঙ্কাকে সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এক খোলা চিঠিতে নিউসম বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।
মৃত্যুদণ্ডের তালিকা কার্যত শূন্যে নামবে
গভর্নরের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের তালিকা কার্যত শূন্যে নেমে আসবে। যদিও অঙ্গরাজ্যটিতে গত ২০ বছরে কোনো বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াতেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ছিলেন।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের (ডিপিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। অথচ এ সময়ে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ভুল বিচারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
মৃত্যুদণ্ডের বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুল, জাতিগত বৈষম্য এবং নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। ডিপিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্তত ২০৩ জন পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকদের দাবি, কঠোর এ শাস্তি গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। তবে সমালোচকদের মতে, কয়েক দশকের গবেষণায় অপরাধ প্রতিরোধে মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত আগস্টে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তবে প্রায় ৭৩ শতাংশ মনে করেন, নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আদালতের পর্যালোচনা প্রয়োজন
ডিপিআইসি জানিয়েছে, গভর্নরের ঘোষিত সাজা কমানোর সিদ্ধান্তগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে। অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, একাধিক গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা কমানোর ক্ষেত্রে আদালতের পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক।
ডিপিআইসির নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহের এক বিবৃতিতে বলেন, নিউসমের এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অতীতে অন্য গভর্নররা ব্যাপক ক্ষমা ঘোষণা করলেও এত বড় পরিসরে কেউ সাজা কমাননি।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ এবং এখন গণহারে সাজা কমানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক আমূল বদলে দিয়েছেন নিউসম।
ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে নিউসমের সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের ২৩টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্য কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আইনগতভাবে এ শাস্তির বিধান থাকলেও কার্যত তা প্রয়োগ করা হয় না। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুতর ফেডারেল অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত এপ্রিলে তাঁর প্রশাসন ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ শাস্তির প্রয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
উল্লেখ্য, উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়া একসময় কঠোর অপরাধ দমননীতির ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়া প্রথম দিকের অঙ্গরাজ্য হিসেবে ‘থ্রি স্ট্রাইকস’ আইন চালু করে। এ আইনে বারবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় সাফল্যের কয়েক দিন পর নিউসমের এ ঘোষণা এলো। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন তিনি।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক