যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ইউক্রেন কত দিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে—এ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে মতবিরোধ এবং সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় কিয়েভের উদ্বেগ বেড়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তার বড় অংশের দায়িত্ব নিলেও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প তৈরি করা এখনো কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দ্রুত চাপে পড়তে পারে। তবে দেশটি কত দিন যুদ্ধ চালাতে পারবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা কঠিন। পরিস্থিতি নির্ভর করবে ইউরোপের সহায়তা, ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কতটা অব্যাহত থাকে, তার ওপর।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের চাপ কিয়েভের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি তা রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন আর্থিক সহায়তা কমেছে, দায়িত্ব বেড়েছে ইউরোপের২০২৫ সালের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা প্যাকেজ বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এরপর ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তার বড় অংশের দায়িত্ব নেয়। একই সময়ে ইউক্রেন নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করে।
জার্মানির কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অন্তত ১৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ২২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ইউরোপের মধ্যে জার্মানি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের যুক্তরাজ্য ও নরওয়েও ইউক্রেনকে সহায়তা করেছে।
তবে ইউরোপের অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্র কেনা হলেও সেগুলো ইউক্রেনে পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে পেন্টাগনের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে অর্থের জোগান ইউরোপ দিলেও অস্ত্র সরবরাহের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। আগে সরবরাহের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তখনো পৌঁছায়নি বলে তাঁর বক্তব্য।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যাওয়া বা অত্যন্ত কমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।
জেলেনস্কি মিত্রদের কাছে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান—রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা এবং ইউক্রেনকে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তবে মার্কিন অস্ত্রের চুক্তি ও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে কি না, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিকল্প সীমিতআর্থিক সহায়তার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা রয়েছে। উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো সক্ষমতায় ইউরোপের বিকল্প এখনো সীমিত।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রাশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যানের মতে, কয়েক দশক ধরে ইউরোপীয় দেশগুলো এসব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। ফলে এখন নিজস্ব বিকল্প গড়ে তোলা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের কর্মকর্তারা কয়েকটি রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গোয়েন্দা সতর্কবার্তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এতে বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সুযোগ কমেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রাম্প এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পরে জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আবার চালু হয়েছে।
স্টারশিল্ড নিয়ে বিতর্ক, ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সামরিক কার্যক্রমেস্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ব্যবস্থাটিতে পূর্ণ প্রবেশাধিকার আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সব এলাকায় সেবার গতি ও কার্যকারিতা স্বাভাবিক হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, স্যাটেলাইট যোগাযোগের গতি সীমিত থাকায় উচ্চগতির সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন পরিচালনায় সমস্যা হয়েছে। সম্মুখযুদ্ধের কয়েকটি এলাকায় সামরিক অভিযান এবং রুশ হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কার্যকারিতাও ব্যাহত হয়েছে বলে তাঁরা জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা স্টারশিল্ড ব্যবহারে গতি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। ইলন মাস্কও এককভাবে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তবে তিনি বলেছেন, সেবাটির গতি বা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট।
মাস্ক অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিংকের বাণিজ্যিক সেবা ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে স্বল্প মেয়াদে ইউক্রেন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপ নিজস্ব প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে পারে।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনে লাভবান হতে পারে রাশিয়াযুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রভাব সামরিক সহায়তার বাইরেও বিস্তৃত। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য বাড়লে রাশিয়া দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের রাশিয়া ও ইউরেশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক নাতিয়া সেস্কুরিয়ার মতে, ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মস্কোর মধ্যে এমন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে যে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ইউরোপের সমর্থনও দুর্বল হয়ে পড়বে।
নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জন লাফের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নীতিগত দূরত্ব বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং ইউক্রেনের পাল্টা হামলা নিয়ে মতবিরোধ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
প্রতিবেদনে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে বিলম্ব এবং জ্বালানি বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে মস্কোর ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কত দিন যুদ্ধ চালাতে পারবে ইউক্রেন?ইউক্রেন ইতিমধ্যে মার্কিন আর্থিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর ইউরোপের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প তৈরি করতে সময় লাগবে।
স্বল্প মেয়াদে মার্কিন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত হলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা এবং বেসামরিক নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের বাড়তি অর্থায়ন, নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে।
তবে শুধু মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলেই ইউক্রেন কত দিন যুদ্ধ চালাতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। যুদ্ধের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত, ইউক্রেনের উৎপাদন সক্ষমতা, ইউরোপের রাজনৈতিক ঐক্য, রাশিয়ার সামরিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতির ওপর।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কেবল অর্থের ঘাটতি নয়; বরং আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প দ্রুত গড়ে তুলতে না পারা।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক