প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রবালপ্রাচীরও গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কঠোর আইনি ব্যবস্থার কথা পরিবেশ অধিদপ্তরেরপরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাবরিন সুলতানা বলেন, নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষায় এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, মাছের আড়ত ও ফলের দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে পলিথিনের ব্যবহার চলছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে বহুমুখী ঝুঁকিবিশেষজ্ঞদের মতে, যত্রতত্র পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। এসব বর্জ্যে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র কণা পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সংস্থাগুলো প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করলে পরিবেশদূষণ কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, নদী, খাল, পুকুর ও মাটিতে জমে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ বাড়ায়। গরু, ছাগল, কচ্ছপ, মাছ ও সামুদ্রিক পাখি এসব বর্জ্য খেয়ে অপুষ্টি ও অন্যান্য ক্ষতির শিকার হতে পারে; এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর গ্যাস ও কণা শ্বাসনালিতে জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।
বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারের পরামর্শসুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পলিথিনের ব্যবহার কমাতে কাপড়, পাট ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগের সহজলভ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নিষিদ্ধ পলিথিন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরও জোরদার করা দরকার।
তিনি পলিথিনের পরিবর্তে কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহারের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
বিকল্পের অভাবে বাজারে পলিথিনের ব্যবহাররাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় নানা ধরনের পণ্য বিক্রিতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। সবজি বিক্রেতা মো. মনির বলেন, বিকল্প ব্যাগ সহজে পাওয়া যায় না। আবার অনেক ক্রেতা বাজারে আসার সময় নিজেদের ব্যাগ সঙ্গে আনেন না। এ কারণে পলিথিন ছাড়া পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্রেতা জাকির হোসেন বলেন, পলিথিনের দাম কম এবং এতে বিভিন্ন পণ্য আলাদা করে রাখা সহজ। বাজারে বিকল্প ব্যাগের সহজলভ্যতা না থাকায় এর ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
২০০২ সালের ১ মার্চ তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পরও বাজারে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন সেন্টমার্টিনসেন্টমার্টিন দ্বীপের উপকূল ও সমুদ্রসৈকতে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জমছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নাফ নদীর মোহনা, টেকনাফ ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকা ছাড়াও মাছ ধরার নৌকা, জাহাজ এবং সমুদ্রে ফেলে দেওয়া বর্জ্য স্রোতের সঙ্গে ভেসে দ্বীপে পৌঁছাচ্ছে। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ফেলে যাওয়া বর্জ্যও দূষণ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের দাবি, দ্বীপে পড়ে থাকা কিছু বোতল ও প্যাকেটে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের লোগো এবং বিদেশি ভাষার লেখা দেখা গেছে। সমুদ্রস্রোত ও বাতাসে ভেসে প্রতিবেশী দেশগুলোর উপকূল থেকেও এসব বর্জ্য আসতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বর্জ্যের উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিনের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দ্বীপে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ ও কেয়া ফল সংগ্রহ এবং কচ্ছপ, পাখি, প্রবাল ও তারামাছের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা বা নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছে। সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহনও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া পলিথিন বহন এবং ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, শ্যাম্পু ও সাবানের ছোট প্যাকেট এবং ৫০০ মিলি ও এক লিটারের পানির বোতল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্লাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি বিকল্প ব্যাগ সহজলভ্য করা, বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা উন্নত করা এবং ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সেন্টমার্টিনসহ উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বর্জ্যের উৎস শনাক্ত ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক