বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ফলে নাগরিকদের ভোটাধিকার হুমকির মুখে পড়েছে। তাঁরা ভোটার তালিকা সংশোধনের কার্যক্রম বন্ধ এবং নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মৃত ভোটার, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন এবং ভুয়া তথ্য বাদ দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে ভারতে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলছে। গত বছর শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, এই সংশোধনের ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মুসলিমরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোট দেওয়ার অধিকার হারাতে পারেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী অভয় আরিয়ান বলেন, এত বড় জনসমাগম সরকারের জন্য জনগণের দাবি শোনার স্পষ্ট বার্তা। আরেক বিক্ষোভকারী মেহভাইশের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের অধীনে দীর্ঘদিনের অন্যায়-অবিচারের অভিযোগের পর ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তাঁদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা, মেট্রো স্টেশন বন্ধবিক্ষোভের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো সোমবার দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বসানো হয় ভারী ধাতব ব্যারিকেড। বন্ধ রাখা হয় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সংবিধানের একটি কপি হাতে নিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগিয়ে যান। পরে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে রিট আবেদন করা হয়।
এর আগে সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ চলাকালে আয়োজকসহ হাজারো মানুষকে আটক করা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরে তাঁদের অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের তিনজন শীর্ষ নেতাও ছিলেন।
পুলিশি আচরণ নিয়ে অভিযোগবিরোধী নেতারা অভিযোগ করেছেন, ব্যাপক ধরপাকড়ের মাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসের অভিযোগ, রোববারের বিক্ষোভে পুলিশ তাঁকে হেনস্তা করে, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং মারধর করে। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকও আটক হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁদের দাবি, পরিচয়পত্র দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাঁদের আটক করে। ডিজিটাল সাংবাদিক নীতিন কাটিয়ার ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে অভিযোগ করেন, আটক অবস্থায় পুলিশ তাঁর চোখে ঘুষি মেরেছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাভোটার তালিকা সংশোধনবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন প্রধান জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে।
সোমবার দিল্লি পুলিশ জানায়, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের জন্তর মন্তরকে আর আনুষ্ঠানিক বিক্ষোভস্থল হিসেবে নির্ধারিত রাখা হচ্ছে না। তবে আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থল হিসেবে বন্ধ করে দিলেও প্রতিবাদ থামবে না।
অন্যদিকে, বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা এবং রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ক্ষমতায় ফেরার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকেই কংগ্রেস এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে চলমান বিক্ষোভ ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আন্দোলন আরও বিস্তৃত হলে তা মোদি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও রয়টার্স।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক