মোগলবিরোধী প্রতিরোধের কিংবদন্তি মসনদে আলা ঈসা খাঁ

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg মোগলবিরোধী প্রতিরোধের কিংবদন্তি মসনদে আলা ঈসা খাঁ\
ষোড়শ শতকের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মসনদে আলা ঈসা খাঁ এক অনন্য চরিত্র। সম্রাট আকবরের নেতৃত্বাধীন মোগল সাম্রাজ্যের পূর্ববঙ্গমুখী সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ভাটি অঞ্চলে তিনি যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সামরিক দক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন মোগল বাহিনীকে প্রতিহত করেন।

সমকালেই সাধারণ মানুষের কাছে ঈসা খাঁ বীরপুরুষ ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে তার বীরত্ব, সংগ্রাম ও জীবনকে ঘিরে বাংলার লোকসাহিত্যেও গড়ে ওঠে নানা কাহিনি ও পালাগান। তবে লোকগাথার ঈসা খাঁ এবং ঐতিহাসিক ঈসা খাঁর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার জীবন সম্পর্কে সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য দলিলও খুব সীমিত। ফলে ঈসা খাঁর ইতিহাস পুনর্গঠনে প্রধানত মোগল দরবারের ইতিহাস, বিশেষ করে আবুল ফজলের রচনা এবং পরবর্তী গবেষণার ওপর নির্ভর করতে হয়।

জন্ম ও শৈশবের অনিশ্চিত অধ্যায়

ঈসা খাঁর জন্মতারিখ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও কালক্রম বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, ১৫৩৩ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে কোনো একসময় তার জন্ম হয়। তার বাবা সুলায়মান গজদানী বাংলার হোসেন শাহি বংশের শেষ শাসক গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের জামাতা ছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনের অবসানের পর সুর আফগানরা বাংলার ক্ষমতা দখল করে। সুলায়মান গজদানী পরাজিত সুলতানি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে নিহত হন।

পিতার মৃত্যুর পর ঈসা খাঁ ও তার এক ভাইকে দাস হিসেবে বিক্রি করে মধ্য এশিয়ার কোনো অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় পর তার চাচা কুতুবুদ্দিন তাদের উদ্ধার করে বাংলায় ফিরিয়ে আনেন। পরে পৈতৃক জমিদারি সরাইল পরগনায় ঈসা খাঁকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

সেখান থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক উত্থান।

সরাইল থেকে ভাটির প্রধান শক্তি

সরাইলের একজন স্থানীয় জমিদার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যে সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় নিজের প্রভাব বাড়াতে থাকেন ঈসা খাঁ। কত্রাবো, পরে সোনারগাঁও ও জঙ্গলবাড়ীকে কেন্দ্র করে তিনি ভাটি অঞ্চলে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।

১৫৮৪ সালের মধ্যে তার কর্তৃত্ব পশ্চিম সিলেট, ত্রিপুরা, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং যমুনার পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। নদী, বিল, হাওর ও জলাভূমিবেষ্টিত ভাটি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি তার প্রতিরোধযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৫৭৬ সালে দাউদ খাঁ কররানীর পতনের পর বাংলায় মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জোরদার হয়। স্থানীয় আফগান সর্দার ও ভূঁইয়ারা নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষায় মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে ধীরে ধীরে উঠে আসেন ঈসা খাঁ।

মোগলদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত

মোগলদের সঙ্গে ঈসা খাঁর সংঘাত ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ১৫৭৮ সালে খাঁ জাহানের বাহিনী ভাটি অঞ্চলে প্রবেশ করলে তারা প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এরপর ১৫৮৪ ও ১৫৮৫ সালে শাহবাজ খাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানও ঈসা খাঁর প্রতিরোধ ভাঙতে ব্যর্থ হয়।

নদীপথ ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতির সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্থল ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ঈসা খাঁ। মোগলদের ধারাবাহিক অভিযানে সাফল্য না আসায় একপর্যায়ে সম্রাট আকবর সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার পথও অনুসরণ করেন।

তবে এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৫৯৫ থেকে ১৫৯৭ সালের মধ্যে রাজা মানসিংহের নেতৃত্বে নতুন করে মোগল অভিযান শুরু হলে ভাটিতে আবার সংঘর্ষ তীব্র হয়।

মেঘনার নৌযুদ্ধে মোগলদের পরাজয়

১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মেঘনা ও সংলগ্ন নৌপথে গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধে ঈসা খাঁ ও মাসুম খাঁ কাবুলির যৌথ বাহিনী মোগল নৌবহরকে পরাজিত করে। ওই যুদ্ধে মানসিংহের পুত্র দুর্জন সিংহসহ বহু মোগল সৈন্য নিহত হন।

এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভাটি অঞ্চলে ঈসা খাঁর সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। আফগান ও স্থানীয় বিভিন্ন শক্তিও তার নেতৃত্বে মোগলবিরোধী প্রতিরোধে যুক্ত হয়। খাজা ওসমান, মাসুম খাঁ কাবুলি ও তাদের সহযোগীরাও এই বৃহত্তর প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ফলে ঈসা খাঁর লড়াই শুধু ব্যক্তিগত জমিদারি রক্ষার সংঘাত ছিল না; তা ষোড়শ শতকের বাংলায় মোগল সাম্রাজ্য বিস্তারের বিরুদ্ধে স্থানীয় ও আফগান শক্তির বৃহত্তর প্রতিরোধের অংশে পরিণত হয়।

মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের অবসান

ঈসা খাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী মাসুম খাঁ কাবুলি ১৫৯৯ সালের ১০ মে কত্রাবে অসুস্থ হয়ে মারা যান। এর কয়েক মাস পর, একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ঈসা খাঁর মৃত্যু হয়।

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভাটি অঞ্চলে মোগলবিরোধী প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে তার উত্তরসূরিরা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধ ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ঈসা খাঁর মতো বিস্তৃত নেতৃত্ব আর গড়ে ওঠেনি।

লোকস্মৃতিতে অমর ঈসা খাঁ

ঈসা খাঁর জীবন ও সংগ্রাম পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকসাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নেয়। গ্রামীণ কবি ও গীতিকাররা তার বীরত্ব, সংগ্রাম ও ব্যক্তিজীবনকে কেন্দ্র করে নানা পালাগান ও লোকগাথা রচনা করেন।

রায়বাহাদুর ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মৈমনসিংহ গীতিকার দ্বিতীয় খণ্ডে ‘দেওয়ান ইশা খাঁ মসনদালী’ নামে একটি গাথাও প্রকাশিত হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এই লোকগাথার ঈসা খাঁ মূলত কিংবদন্তির চরিত্র; তাকে সরাসরি ঐতিহাসিক ঈসা খাঁর সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।

মাজার নিয়েও রয়েছে মতভেদ

ঈসা খাঁর সমাধিস্থল নিয়েও নিশ্চিত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামের একটি কবরকে স্থানীয়ভাবে ঈসা খাঁর মাজার হিসেবে পরিচিত করা হয়। তবে এ পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামানের Identity of a Muslim Family in Colonial Bengal: Between Memories and History গ্রন্থেও বক্তারপুরের কবরকে ঈসা খাঁর মাজার হিসেবে দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, পাশাপাশি এ দাবির বিরোধী মতও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বক্তারপুরের কবরটি ঈসা খাঁর সমাধি—এমন দাবি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য আরও নির্ভরযোগ্য লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রয়োজন।

ঐতিহাসিক দলিলের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ও লোকস্মৃতিতে ঈসা খাঁর অবস্থান অনস্বীকার্য। ভাটি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে শক্তিতে পরিণত করে মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ প্রতিরোধ তিনি গড়ে তুলেছিলেন, সেটিই তাকে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্রে পরিণত করেছে।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ অনলাইন; আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’; ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’; মোহাম্মদ রশিদুজ্জামানের ‘Identity of a Muslim Family in Colonial Bengal: Between Memories and History’।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad