শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন আচরণবিধি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৩ দুপুর
  • ৩১১২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, শিক্ষকদের পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বিধিতে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা এবং শিক্ষকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক শিক্ষাবহির্ভূত পেশা ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের নির্দেশনার পর সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খসড়া পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের পর তা চূড়ান্ত করা হবে। ফলে কোন কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ হবে এবং কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে শিক্ষকতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, রাজনৈতিক পদ-পদবি ধারণ, দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কিংবা শিক্ষকতার প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো বিষয় কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা বিধিমালায় স্পষ্ট করার উদ্যোগ রয়েছে।

রাজনীতির পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কোনো শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার পেশাগত অবস্থানের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। এতে শিক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার বিষয়ে আচরণবিধিতে স্পষ্ট নির্দেশনা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

শিক্ষাবহির্ভূত পেশাতেও আসতে পারে সীমাবদ্ধতা

শুধু রাজনীতি নয়, শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশা, ব্যবসা বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়েও বিধিনিষেধ আসতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন কোনো কর্মকাণ্ড, যা নিয়মিত পাঠদান কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, তা নতুন আচরণবিধির আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর মাধ্যমে শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা বাড়ানোর কাঠামো তৈরি করতে চায় সরকার।

১৫ দফা অনুশাসন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রস্তাবের পর ১৫ দফা অনুশাসন দেওয়া হয়। পরে গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সভার ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)সহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ১৫ দফা অনুশাসনের অন্যতম বিষয় হলো শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখা।

সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মাধ্যমিক শিক্ষার সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়।

সভায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিংনির্ভরতা, স্মার্টফোন আসক্তি ও আনন্দময় শিক্ষার ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণ উঠে আসে। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান তদারকি এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।

বাড়ছে শ্রেণিকক্ষের নজরদারি

শিক্ষকদের নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদান মনিটরিংয়ের নির্দেশনা রয়েছে।

মাউশির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকদের তথ্য হালনাগাদ এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ভিডিও কলে মনিটরিং করবেন বলেও কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়ন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব

শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এসব বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশনাও রয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; এটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করতে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আচরণবিধির উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষককে অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং শিক্ষকতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা। শিক্ষকরা যাতে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে মনোযোগ দেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।

মাউশির মহাপরিচালক আরও বলেন, দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আস্থা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করা হচ্ছে। আচরণবিধির পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পাঠদানের মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভালো কাজের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের সক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

তথ্যসূত্র: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad