মিডিয়ার সামনে একজন চিকিৎসককে ডেকে বলা হলো—‘ডাক্তার কই? আসেন ডাক্তার সাহেব! আসেন! কথাগুলো শুনে লজ্জিত হন না?’
রোগীর কষ্ট দেখে ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। হাসপাতালের সেবা ব্যাহত হলে জনগণের প্রশ্ন করার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি হাসপাতালের বহুস্তরীয় প্রশাসনিক ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় কি একজন ওয়ার্ড চিকিৎসকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়?
ক্যামেরার সামনে চিকিৎসককে অপমান করা সহজ। কিন্তু যে ভঙ্গুর ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, সেই ব্যবস্থার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করা কঠিন। অথচ সেই কঠিন কাজটিই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের প্যাথলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি সেবা সচল রাখা কি রোগী দেখার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের কাজ?
যদি তা না হয়, তাহলে প্যাথলজি বিভাগ, হাসপাতাল প্রশাসন, ক্রয় বিভাগ, স্টোর, সরবরাহব্যবস্থা, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ শাখা এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কেন রয়েছেন?
একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব রোগী পরীক্ষা করা, রোগ নির্ণয় করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া। তিনি কি রোগী দেখা বন্ধ করে বিকারক কেনার দরপত্র খুঁজবেন? পরীক্ষাগারের মেশিন মেরামত করবেন? জনবল নিয়োগ দেবেন? নাকি সরবরাহ বন্ধ রেখে লাভবান হওয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন?
জরুরি পরীক্ষার সুযোগ না থাকলে চিকিৎসক কী করবেন?একজন সংকটাপন্ন রোগীর জরুরি রক্তের লবণ পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। রক্তে সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের অস্বাভাবিকতা অনেক সময় খিঁচুনি, অজ্ঞানতা, প্রাণঘাতী হৃদ্স্পন্দনের অনিয়ম, এমনকি আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কিডনি বিকলতা, হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, ডায়াবেটিসের জটিলতা, গুরুতর সংক্রমণ কিংবা নিবিড় পরিচর্যার রোগীদের ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু হাসপাতালে যদি সেই পরীক্ষা না হয়, চিকিৎসক কী করবেন?
তিনি কি শুধু অপমানের ভয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা শুরু করবেন?
না। একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবেন—প্রয়োজনে হাসপাতালের বাইরেও। কারণ তাঁর প্রথম দায়িত্ব রোগীর নিরাপত্তা। রোগীকে অন্ধকারে রেখে অনুমাননির্ভর চিকিৎসা করা কোনো দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, চিকিৎসককে কেন বাইরে পরীক্ষা লিখতে হলো। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
রক্তের লবণ পরীক্ষার মতো মৌলিক পরীক্ষা কেন বন্ধ?
কত দিন ধরে বিকারক সরবরাহ নেই?
চাহিদাপত্র কি সময়মতো পাঠানো হয়েছিল?
প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছিল কি না?
ক্রয়প্রক্রিয়া কোথায় আটকে আছে?
দায়িত্বপ্রাপ্ত সরবরাহকারী কেন বিকারক সরবরাহ করেনি?
মেশিন নষ্ট থাকলে তা মেরামত করা হয়নি কেন?
পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ ও সহকারী রয়েছেন কি না?
হাসপাতাল প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
এই অচলাবস্থার কারণে রোগীদের অতিরিক্ত খরচ, চিকিৎসায় বিলম্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকির দায় কে নেবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে একজন চিকিৎসককে প্রকাশ্যে লজ্জিত করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং এতে মূল সমস্যাটিই আড়ালে থেকে যায়।
প্যাথলজি সেবা সচল রাখা কেন জরুরিহাসপাতালের প্যাথলজি সেবা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি রোগ নির্ণয় ও নিরাপদ চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। পরীক্ষার ফল ছাড়া অনেক জরুরি চিকিৎসাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একটি সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগার সচল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত বিকারক সরবরাহ, প্রশিক্ষিত জনবল, কার্যকর যন্ত্রপাতি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ, সঠিক স্টোর ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।
এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতা।
চিকিৎসককে জনরোষের মুখে ঠেলে দেওয়া নয়চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসক কোনো জাদুকর নন যে বিকারক নেই, যন্ত্র অচল, জনবল নেই, বেড নেই—তারপরও সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন।
সীমিত সামর্থ্য ও প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও চিকিৎসকেরা প্রতিদিন রোগীর পাশে থাকেন। অনেক সময় নিজেদের অপমান, ক্লান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা উপেক্ষা করেই তাঁরা সেবা দিয়ে যান।
যাঁরা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে রোগীকে বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে চিকিৎসককে অপমান করা অন্যায়। এতে চিকিৎসকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রোগীর নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারও দুর্বল হয়।
দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবেলজ্জা যদি কারও পাওয়ার থাকে, তবে সেই দায় ভাগ করে নিতে হবে—ক্রয়ব্যবস্থার ব্যর্থতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্নীতি,

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক