গ্রামের একটি বাড়িতে থাকত বিড়াল টুসু। তার দুই ছানা—টিনা ও মিনা। একদিন তারা মাকে বলল, ‘মা, আমাদের আর গ্রামে থাকতে ভালো লাগছে না। আমরা কি শহরে গিয়ে থাকতে পারি না? গ্রামের মানুষ যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখে। চারদিকে মশামাছির উপদ্রব। পচা-নোংরা দুর্গন্ধে টেকাই দায়। মশার কামড়ে আমাদের শরীরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।’
ছানাদের কথা শুনে টুসু বলল, ‘ঠিক আছে, তোমরা যখন বলছ, আমরা শহরে যাব। তবে শহরের পরিবেশে তোমরা মানিয়ে চলতে পারবে তো?’
টিনা ও মিনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নেড়ে জানাল, তারা পারবে।
পরদিন মা ও দুই ছানা আনন্দ করতে করতে শহরের উদ্দেশে রওনা হলো। অনেক কষ্টে শহরের একটি কলোনিতে পৌঁছে তারা একটি বড় ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল। অচেনা পরিবেশে তিনজনের মনেই ভয়—কেউ যদি তাদের তাড়িয়ে দেয়!
কিছুক্ষণ পর ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে বেরিয়ে এল। তিনটি বিড়ালকে দেখে মেয়েটি ভীষণ খুশি হলো। হাত নেড়ে বলল, ‘আয় আয় পুষি, আমার কাছে আয়।’
মেয়েটির নাম টুম্পা। বয়স নয়-দশ বছর। সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে ভাত, মাছ ও মাংস এনে বিড়াল তিনটিকে খেতে দিল। টুম্পার আতিথেয়তায় টুসু, টিনা ও মিনা মুগ্ধ হয়ে গেল। সেদিন থেকে তারা ওই ফ্ল্যাটের নতুন অতিথি।
টুম্পার মা-বাবাও বিড়াল তিনটিকে দেখে অবাক হলেন। তবে মেয়ের আনন্দ দেখে তারাও খুশি। তারা মনে করলেন, টুম্পা এবার তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করে নিজের একাকিত্ব কিছুটা কাটাতে পারবে।
পেট ভরে ভালো খাবার খাওয়ার পর রাতের বেলায় ফ্ল্যাটের এক কোণে তিন বিড়াল ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আধা ঘণ্টা না যেতেই শুরু হলো বিপত্তি।
হঠাৎ চারদিক থেকে গুনগুন শব্দ করে মশার দল এগিয়ে এল। শব্দ শুনে টিনা ও মিনা ভয় পেয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকশ মশা তাদের শরীরে হুল ফোটাতে শুরু করল। একেকটি কামড় যেন চাবুকের আঘাতের মতো বিঁধছিল।
টিনা-মিনার কাছে শহরের মশাগুলোকে মনে হলো ভয়ংকর। তাদের মনে হলো, গ্রামের মশাগুলো আকারে ছোট ও তুলনামূলকভাবে কম উপদ্রবকারী। শহরের মশাগুলো যেন একেকটি ডাইনোসর!
বিপদে পড়ে টিনা ও মিনা মাকে বলল, ‘আহ্! আমরা কী ভুল করলাম! এভাবে আরও দুই রাত কাটালে আমাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভোর হলেই আমরা বাড়ির দিকে রওনা হব।’
তারা বুঝতে পারল, গ্রামে খাবারের কিছুটা সমস্যা থাকলেও সেখানে তারা সুখেই ছিল। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে শহরে এসে বরং আরও বড় বিপদে পড়েছে।
রাত না পোহাতেই টিনা, মিনা ও তাদের মা টুসু গ্রামের পথে রওনা হলো। যেতে যেতে তারা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—লোভ করে আর কখনো নিজেদের পরিচিত ও নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে যাবে না।
তাদের উপলব্ধি হলো, যেখানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখানেই অনেক সময় প্রকৃত সুখ-শান্তি লুকিয়ে থাকে। ভাঙা কুঁড়েঘরেও যদি শান্তি থাকে, তবে সেটিই হতে পারে সবচেয়ে ভালো ঠিকানা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক