ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব সাধারণত দু-এক দিনের মধ্যে খুচরা বাজারে পড়ে। ফলে সামনে নিত্যপণ্যের বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এতে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে বাজারে আলু ও পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। বর্তমানে আলু কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
দুদিনে সবজির দাম বাড়লগত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারে পটোল, ধুন্দল ও ঝিঙা কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার একই সবজির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
লম্বা বেগুনের দাম দুদিনে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে। ঢ্যাঁড়শের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হয়েছে। অন্যান্য সবজির দামও কেজিতে বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। বুধবার কাঁচামরিচের কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা থাকলেও বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনে আগারগাঁওয়ে ভ্যানে বিক্রি করেন আবদুর রহিম। তিনি বলেন, এক দিনের ব্যবধানে কারওয়ান বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির পাঁচ কেজির পাল্লায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
তেলের সরবরাহ বাড়লেও দাম বেশিকয়েক দিন ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কিছুটা সংকট ছিল। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ানোর পর সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে।
তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম সরকার নির্ধারিত পর্যায়ে নেই। সরকার নির্ধারিত দর ১৮০ টাকা হলেও বাজারে তা প্রায় ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে খোলা পাম অয়েলের নির্ধারিত দাম ১৬৩ টাকা হলেও ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে প্রায় ১৭৫ টাকা।
রাজধানীর বেগুনবাড়ীর বাসিন্দা মারিয়া বেগম কারওয়ান বাজার থেকে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ টাকায় কিনেছেন। তাঁর অভিযোগ, তেল ও আটার দাম বাড়তে থাকায় সংসারের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
খোলা চিনিতেও বাড়তি চাপপ্যাকেটজাত চিনির চেয়ে খোলা চিনির দাম এখন বেশি। প্যাকেট চিনি কেজি ১১০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খোলা চিনির জন্য ক্রেতাকে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা দিতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের মালিক মো. রায়হান বলেন, কোম্পানিগুলো প্যাকেটের গায়ে ১১০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করলেও ১০৯ টাকায় সরবরাহ করছে। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীদের লাভ থাকে মাত্র এক টাকা। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলো প্যাকেট চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খোলা চিনির চাহিদা বেড়েছে।
তাঁর ভাষ্য, ডাল, আটা, চিনিসহ কয়েকটি পণ্যের পাইকারি দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়বে।
আটা-ময়দার বাজারেও ঊর্ধ্বগতিগত দেড় মাসে আটার দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ময়দার দামও কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা বেড়েছে। খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ছোলা, ছোলার বুট ও মসুর ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা আটার দাম ৩ শতাংশ এবং খোলা ময়দার দাম ১৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চিনির দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
ডিম-মুরগির দামও ঊর্ধ্বমুখীপ্রায় দেড় মাস ধরে ডিম ও মুরগির বাজারেও দাম বাড়ছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের ক্রেতা মিজানুর রহমান পেশায় মোটর ওয়ার্কশপের কর্মী। তিনি বলেন, দুদিন আগে যে পরিমাণ কাঁচামরিচ ২০ টাকায় কিনেছেন, বৃহস্পতিবার একই পরিমাণ কিনতে হয়েছে ৪০ টাকায়।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বেতন বাড়ার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
আগারগাঁওয়ের আরেক ক্রেতা কামাল হোসেন বেসরকারি চাকরিজীবী। তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, একদিকে পরিবারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ফলে বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাজার তদারকির দাবিনিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি ও বাজারমূল্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কঠোর বাজার তদারকির দাবি জানিয়েছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তাও বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, টিসিবির মাধ্যমে মাসে প্রায় ৭৮ লাখ পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়মিত ওএমএস কার্যক্রমও চলছে।
তিনি বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র খোলা, পণ্য আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক