টেলিযোগাযোগ সেবার মানোন্নয়ন, গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। শুনানিতে গ্রাহকদের অভিযোগ ও মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারনেট ও ভয়েস কলের মূল্য, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, কলড্রপ, ডাটা প্যাকেজ, সিম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে ‘টেলিযোগাযোগ সেবা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম’ শীর্ষক এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন।
অনলাইনে আয়োজিত গণশুনানিতে গ্রাহক, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে টেলিযোগাযোগ সেবার মান, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য, মোবাইল ডাটা ও ভয়েস কলের চার্জ এবং গ্রাহকসেবা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন, অভিযোগ ও মতামত তুলে ধরা হয়।
বিটিআরসি জানায়, গণশুনানিকে সামনে রেখে গত ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে ২ হাজার ৯৯০ জন গ্রাহক নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবী ছিলেন ১ হাজার ৪৭ জন, শিক্ষার্থী ৬৩৮ জন এবং নারী অংশগ্রহণকারী ছিলেন ১৭২ জন।
নিবন্ধিত অভিযোগ ও মতামতের মধ্যে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ-সংক্রান্ত ১ হাজার ৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগ-সংক্রান্ত ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম বিভাগ-সংক্রান্ত ৬৩টি, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগ-সংক্রান্ত ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট-সংক্রান্ত ৫টি বিষয় ছিল। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ট্যারিফ, ডাটা স্পিড ও মেয়াদ, ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর, লাইসেন্স ও সেবার মান নিয়ে।
গণশুনানিতে জামালপুরের রাকীব রায়হান মোবাইল অপারেটরদের কলরেট কমানো এবং গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ নিয়ে জানতে চান।
জবাবে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে বিটিআরসি নির্ধারিত ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা। গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানোর বিষয়ে বিটিআরসিতে কাজ চলছে।
টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আলম পারভেজ বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক রোলআউটের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে টেলিটক। হাওর-বাঁওড়সহ দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাতেও বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
গণশুনানিতে ফুয়াদ হাসান খান ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড এবং মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ (ইএমএফ রেডিয়েশন) নিয়ে প্রশ্ন করেন। বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ পরিমাপ করা হয়। এসব পরিমাপে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ডের তুলনায় বিকিরণের মাত্রা অনেক নিচে পাওয়া গেছে। ফলে বিদ্যমান মাত্রার বিকিরণ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে জানায় কমিশন।
অন্যদিকে আনোয়ার সাদাত নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, মোবাইল অপারেটররা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা আলাদা ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল থাকে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জবাবে বিটিআরসি জানায়, গ্রাহকদের বিভিন্ন চাহিদা বিবেচনায় মোবাইল অপারেটররা বিভিন্ন ডাটা প্যাকেজের সঙ্গে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবিধা যুক্ত করে থাকে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নেটওয়ার্ক সচল না থাকার বিষয়ে কমিশন জানায়, সারাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সক্ষমতা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের কোন এলাকায় কখন কোন মোবাইল টাওয়ার সচল বা অচল রয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে মোবাইল অপারেটরদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
বিটিআরসি আরও জানায়, দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কমিশনে মোট ১৩ হাজার ৯টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে হেল্পলাইনের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫১টি এবং ওয়েববক্সের মাধ্যমে ৭ হাজার ৯৫৮টি অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময়ে ১১ হাজার ২৭৯টি অভিযোগ, অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
গণশুনানিতে বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. মেহেদী-উল-সহিদ, স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডুসহ কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ