কাদামাটি পেরিয়ে স্বপ্নের শিখরে ফারিহা, জাতীয় পর্যায়ে সেরা নারী ফুটবলারের স্বীকৃতি

  • প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:২৬ রাত
  • ১২৩৭৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের মেঠোপথ ধরে সাইকেল চালিয়ে অনুশীলনের মাঠে ছুটে যেত এক কিশোরী। ঘরে ফিরেই তাকে সামলাতে হতো সংসারের কাজ—কখনো ধান রোপণ, কখনো পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়া। এর মাঝেই শুনতে হয়েছে নানা কটূক্তি—‘মেয়ে হয়ে আবার ফুটবল খেলবে?’ কিন্তু কোনো বাধাই দমাতে পারেনি তার স্বপ্নকে।

সেই অদম্য স্বপ্নের নাম জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা মনি। নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের এই কিশোরী দারিদ্র্য, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও শত প্রতিকূলতাকে জয় করে এখন জাতীয় পর্যায়ে নারী ফুটবলের উজ্জ্বল প্রতিভা হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।

‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ফারিহা। তার এই অর্জনে গর্বিত লালপুরবাসী।

রাজশাহী বিভাগের হয়ে ফাইনালের পথে ফারিহা ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা। বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে একাই করেন চার গোল। এরপর সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে করেন আরও একটি গোল। দুই ম্যাচে দলের সাত গোলের মধ্যে পাঁচটিই আসে তার পায়ের জাদুতে।

যদিও ফাইনালে শিরোপা জয় সম্ভব হয়নি, তবে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স বিচারকদের নজর কাড়ে। ফলে সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা হিসেবে তার হাতে উঠে আসে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ পুরস্কার।

গতকাল সোমবার ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাজারো দর্শকের করতালির মাঝে লালপুরের সংগ্রামী কিশোরী ফারিহা গ্রহণ করেন তার অর্জনের স্বীকৃতি।

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

ফারিহার বাবা মুকুল মণ্ডল বাকপ্রতিবন্ধী। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার মা আজেলা বেগম। এলজিইডির রাস্তার দিনমজুর হিসেবে কাজ করে তিনি পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান।

অভাবের সংসারে ভালো বুট, অনুশীলনের খরচ কিংবা যাতায়াত ভাড়া জোগাড় করাও ছিল কঠিন। তবুও ফারিহার স্বপ্ন থেমে থাকেনি। সংসারের প্রয়োজনে ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করেছেন, পচা পানিতে নেমে পাট ধুয়েছেন। দিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েই প্রায় আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে লালপুরের ‘নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে’ নিয়মিত অনুশীলন করেছেন।

দারিদ্র্যের পাশাপাশি তাকে লড়তে হয়েছে সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধেও। ‘মেয়ে হয়ে হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে?’—এমন নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে। কিন্তু নিজের স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসে অটুট থেকে ফারিহা প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা ও পরিশ্রম থাকলে কোনো বাধাই সাফল্যের পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে না।

ফারিহার এই স্বপ্নপূরণের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। পরিবারের পক্ষে যখন অনুশীলনের ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি, তখন তিনি ফারিহার পাশে দাঁড়ান। যাতায়াত ভাড়া, প্রশিক্ষণ খরচ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ নানা সহযোগিতা দিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলে হাতেখড়ি হয় ফারিহার। উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে বাধার মুখে পড়লেও পরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। জাতীয় পর্যায়ে এসে তার প্রতিভার আরও উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে।

জাতীয় নারী ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমাকে নিজের আদর্শ মানেন ফারিহা। তার অনুপ্রেরণায় নিজের জার্সির নম্বর হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১৭ নম্বর।

সাফল্যের পরও বিনয়ী ফারিহা বলেন, ‘আমার সতীর্থরা ভালো পাস দিয়েছে বলেই আমি গোল করতে পেরেছি। এই অর্জন শুধু আমার নয়, পুরো দলের।’

ফারিহার সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক—এটাই প্রত্যাশা।’

কোচ মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, ফারিহা শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ খেলোয়াড়। প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কখনো অনুশীলনে ফাঁকি দেয়নি। তার নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমই তাকে জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়ার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ফারিহার অর্জন শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি পুরো লালপুর উপজেলার গর্ব। দারিদ্র্য ও সামাজিক বাধা জয় করে সে প্রমাণ করেছে—অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই স্বপ্ন থামাতে পারে না।

ফারিহার গল্প শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামীণ মেয়ের স্বপ্ন, সাহস ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মেঠোপথ থেকে জাতীয় পর্যায়ের মঞ্চে উঠে আসা এই কিশোরী এখন দেশের নারী ফুটবলের নতুন অনুপ্রেরণার নাম।

সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে ফারিহা লাল-সবুজের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় গৌরব বয়ে আনবেন—এমন প্রত্যাশা এখন লালপুরবাসীর।

আপনি চাইলে এটিকে �⁠আরও বেশি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার ফিচার স্টাইলে বা �⁠অনলাইন পোর্টালের জন্য SEO-সমৃদ্ধ ভার্সনেও সাজিয়ে দিতে পারি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad