জুলাই গণ-আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন যুবদল নেতা এনআরবি মামুন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি এই জবানবন্দি প্রদান করেন।
জবানবন্দিতে মামুন জানান, তার বয়স আনুমানিক ৪১ বছর। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হাজীগঞ্জ ওয়াবদাপুল এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে ১২ জুলাই থেকে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জেও আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ১৯ জুলাই বিকেল প্রায় ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অবস্থানকালে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ প্রায় একশ সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সমর্থক তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তিনিসহ অনেকেই রাবার বুলেটে আহত হন। তার দাবি, শামীম ওসমানের লোকজনের ছোড়া গুলিতে তার পাশেই থাকা আদিল ও ইয়াসিন নামে দুই আন্দোলনকারী নিহত হন। পরে সহযোদ্ধারা তাকে স্থানীয় এক বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ২০ জুলাই বিশ্রামের পর ২১ জুলাই তিনি আবার আন্দোলনে যোগ দেন।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, ২১ জুলাই সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাইনবোর্ড থেকে চিটাগাং রোডের দিকে যাওয়ার সময় মা হাসপাতালের সামনে অবস্থানকালে বাজারের গলি থেকে শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, কমিশনার রুহুলসহ প্রায় দেড়শ সশস্ত্র ব্যক্তি অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় তাদের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ছিল বলে তিনি দাবি করেন। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর সময় তিনি ডিএনডি খালে পড়ে যান এবং তার উপরের মাড়ির একটি দাঁত ভেঙে যায়।
মামুন আরও বলেন, ৫ আগস্ট সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল করছিলেন। দুপুর দেড়টার দিকে চাষাড়া মোড়ে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা টিপু সুলতান, রিয়াদ, শুভ, শুভ্র, সাংবাদিক রাজু, কমিশনার ডিস বাবু, কেন্দ্রীয় ওলামা লীগের নেতা আনোয়ার, ছাত্রলীগ নেতা ভিকি, রুহুল কমিশনার, শামীম ওসমানের শ্যালক টিটুসহ ১০০ থেকে ১৫০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা চালায় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
হামলার মুখে আন্দোলনকারীরা ল্যাবএইড হাসপাতালের পাশের একটি গলিতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, অয়ন ওসমানের গুলিতে স্বজন নামে এক যুবক আহত হন। পরে তিনি সুজন, তুহিনসহ অন্যদের সহযোগিতায় স্বজনকে সমবায় মার্কেটের নিচে নিয়ে যান, পানি পান করান এবং রিকশায় করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যান।
জবানবন্দিতে মামুন দাবি করেন, আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য আগে থেকেই শামীম ওসমানের নির্দেশনা থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বজনকে চিকিৎসা দেয়নি। পরে স্বজনের বড় ভাই হাসপাতালে এলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আহত স্বজনকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ৬ আগস্ট বিজয় উদযাপনের সময় তিনি জানতে পারেন, আগের দিন আহত হওয়া স্বজন মারা গেছেন। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি স্বজন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক