এক গ্রাহকের অঢেল ব্যাংকঋণে লাগাম, আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ সকাল
  • ১৮৩৩২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশের ব্যাংকিং খাতে একজন গ্রাহকের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের সুযোগ সীমিত করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা মিলিয়ে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নেওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করে দিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড ও পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণের ঝুঁকি হ্রাস, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন থেকেও একই ধরনের প্রস্তাব এসেছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে শিগগিরই এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হতে পারে।

একই গ্রাহকের অতিরিক্ত ঋণ রোধে নতুন ব্যবস্থা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত এক দশকে দুর্বল তদারকি, ঋণ জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুশাসনের অভাবে ব্যাংক খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী একাধিক প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়স্বজন কিংবা সহযোগীদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং পরিশোধ না হওয়ায় খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে একজন গ্রাহক একটি ব্যাংক থেকে ওই ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে পুরো ব্যাংকিং খাত মিলিয়ে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত ঋণ নিতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। নতুন নীতিমালায় সেই সীমা নির্ধারণ করা হবে, যাতে একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত না হয়।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড ও পুঁজিবাজারে জোর

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলো মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করলেও সেই অর্থ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করায় সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এতে তারল্য সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরও বেশি ঋণ দিতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর বন্ড মার্কেট এবং পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে কর্মপরিকল্পনা

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা (এক বছর)

প্রতিটি ব্যাংকের জন্য খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ।

বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকে প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) বাস্তবায়ন।

প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগে খেলাপি ঋণের বিষয় বিবেচনা।

শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (দুই বছর)

আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (ইডব্লিউএস) চালু।

আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন।

জামানতের স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা।

ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা।

নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের উৎসাহ প্রদান।

খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ।

লোন-টু-ইকুইটি কনভার্সন ও লোন টেকওভার নীতিমালা প্রণয়ন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (পাঁচ বছর)

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে একজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা নির্ধারণ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তি, খেলাপিদের রিটের মাধ্যমে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ সীমিত করা, বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন এবং এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হবে।

ব্যাংকারদের মত

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, একজন গ্রাহকের ঋণ গ্রহণে যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান অল্প নিজস্ব মূলধন নিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, বড় অর্থায়নে বন্ড ও ক্যাপিটাল মার্কেটের ব্যবহার বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব মূলধন বাড়াতে উৎসাহিত হবে এবং অর্থায়নের উৎসও বহুমুখী হবে। তবে নতুন নীতিমালা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, কারণ বর্তমানে ব্যাংক খাতে অনেক ‘ফোর্সড লোন’ রয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় করা সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও মূলধনী বিনিয়োগের অর্থায়ন হয় ক্যাপিটাল মার্কেটের মাধ্যমে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণ মূলত কার্যকরী মূলধনের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আশা, নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। একই সঙ্গে বড় ঋণ বিতরণে নতুন সীমা ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad