এনজিওর আড়ালে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: ভারতীয় নাগরিক শম্পা গোস্বামীকে ঘিরে সাতক্ষীরায় তোলপাড়

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ সকাল
  • ১৮১৩৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

সাতক্ষীরায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ‘প্রেরণা’-এর আড়ালে ভারতীয় নাগরিক শম্পা গোস্বামী (চ্যাটার্জি) দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সমাজসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কার্যক্রমের আড়ালে তিনি নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, জমি দখল এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তবে শম্পা গোস্বামী তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল কার্যক্রম

স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাতক্ষীরা শহরের একটি ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে শম্পা গোস্বামীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলেই তিনি নিজের ভারতীয় পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে বিষয়গুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। এমনকি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ না করার জন্যও পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।

প্রভাব খাটিয়ে সম্পদের পাহাড়

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় শম্পা গোস্বামী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, জমি দখল, অর্থ পাচার এবং ভারত-বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব ব্যবহার করে অনিয়ম করার অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়া ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত শুরু হয়নি।

প্রশাসনের দ্বারস্থ স্থানীয়রা

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। তাদের দাবি, প্রেরণা এনজিওর নিবন্ধন, শম্পা গোস্বামীর সম্পদের উৎস এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

প্রবীণ সাংবাদিকের বক্তব্য

সাতক্ষীরার প্রবীণ সাংবাদিক আহমাদুল্লাহ বাচ্চু দাবি করেন, শম্পা গোস্বামীর ভারতে আধার কার্ড, ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্র রয়েছে। এছাড়া নরেন্দ্র মোদির শ্যামনগর সফরের সময় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, শম্পা দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও চাকরি ধরে রাখেন, গাছ কাটার ঘটনায় সাজা ভোগ করেন এবং সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস দখলের অভিযোগেও অভিযুক্ত হন।

দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, শম্পা গোস্বামী বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকত্ব সুবিধা একসঙ্গে ভোগ করছেন। ভারতে তার নামে আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি, আয়কর কার্ড এবং পোস্ট অফিসে একাধিক হিসাব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট পোস্ট অফিসে তার নামে কেভিপি, আরডি ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া বসিরহাটে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকে তার ও তার মায়ের যৌথ ব্যাংক হিসাব এবং নিজের নামে জমি কেনার তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি ২০১৭ ও ২০২২ সালে ভারতে অবস্থান করে অর্থ পাচার করেছেন।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে শাফি মোদ্দাছির খান জ্যোতির সঙ্গে শম্পা গোস্বামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সম্পর্কের প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জে ২৬ কাঠা জমির ওপর একাধিক ভবন, শপিং সেন্টার ও বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণ করলেও তার বৈধ আয়ের উৎস দেখাতে পারেননি।

মেয়ের বিরুদ্ধেও শিক্ষাগত তথ্য গোপনের অভিযোগ

শম্পা গোস্বামীর বড় মেয়ে বৈশাখী চ্যাটার্জির বিরুদ্ধেও শিক্ষাগত তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশে অধ্যয়নরত অবস্থায় ভারতে পুনরায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক পাস করেন। পরে সেই তথ্য গোপন রেখে বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ভর্তি হন।

জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য

সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, শম্পা গোস্বামী নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তিনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, সেখান থেকে অনিয়মের কারণে চাকরিচ্যুত হন বলেও দাবি করেন।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো বিদেশি নাগরিক ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা বা এনজিও পরিচালনা করলে তা গুরুতর অপরাধ। অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রশাসনের অবস্থান

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে এনজিও বা ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নেই। শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শম্পা গোস্বামীর বক্তব্য

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে শম্পা গোস্বামী বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার মা জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং বৈবাহিক সূত্রে বাংলাদেশি হওয়ায় বিষয়টি অপরাধ নয়। ভারতে তার নামে থাকা আধার কার্ডসহ বিভিন্ন নথিকে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা জাল বলে দাবি করেন।

হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। পাশাপাশি স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ তোলেন।

মন্তব্য পাওয়া যায়নি

শম্পা গোস্বামীর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় এক সাংবাদিকের দুটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একজন ফোন রিসিভ করেননি এবং অন্য নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তের দাবি

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিযোগকারী বাসিন্দারা প্রেরণা এনজিওর নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস, নাগরিকত্বের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad