ভরা মৌসুমেও মিলছে না ইলিশ: বরগুনার জেলেদের চোখে অন্ধকার, বাজারে চড়া দাম

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৫ দুপুর
  • ১৩৮৩০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
​ভরা বর্ষা মৌসুমে যেখানে বরগুনার নদী ও সাগরে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা, সেখানে এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। মৌসুম শুরু হলেও সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদী ও সাগরে দিন-রাত জাল ফেলেও শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার হাজার হাজার জেলেকে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে বৈরী আবহাওয়া। ফলে একদিকে পরিবার নিয়ে চরম অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে জেলেদের, অন্যদিকে বরগুনার আড়ত ও মাছ বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র ইলিশ সংকট।​সাগরে গিয়ে খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা

​প্রতিদিন ভোরে বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী ও তালতলী এলাকার শত শত ট্রলার গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও ফিরছে তীব্র হতাশা নিয়ে। প্রতি ট্রিপে জ্বালানি তেলসহ আনুমানিক লাখ টাকার মতো খরচ হলেও, সেই তুলনায় মাছ না পাওয়ায় লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে।

আবুল কালাম (পাথরঘাটা): "আগের তুলনায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এক ট্রিপে বিভিন্ন খরচ মিটিয়ে লাভ তো হয়ই না, উল্টো লোকসানে পড়তে হচ্ছে।" ​লোকমান হোসেন (বরগুনা সদর): "মাছের আশায় ৪ দিন নদীতে কাটিয়েও ইলিশ পাইনি। আয়-রোজগার না থাকায় পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।" ​অবৈধ জাল ও বৈরী আবহাওয়ার ডাবল আঘাত

​জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, কিছু অসাধু চক্র সাগরে ট্রলিং ট্রলারে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট মাছ ও জাটকা নিধন করছে, যার ফলে ইলিশের এই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

​তার ওপর গত রবিবার থেকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি হওয়ায় শত শত ট্রলার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। ধারদেনা আর ঋণ করে ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়া জেলেরা এখন পড়েছেন চরম বিপাকে।

​বাজারে ইলিশের আকাশচুম্বী দাম

​আমদানি কম থাকায় বরগুনার স্থানীয় বাজারগুলোতে ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। খুচরা বাজারে বর্তমান মূল্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

ইলিশের আকার

বর্তমান বাজার মূল্য (প্রতি কেজি)

১ কেজি ওজনের ইলিশ

১২০০ টাকা

মাঝারি সাইজের ইলিশ

৯০০ টাকা

ছোট সাইজের ইলিশ

৬০০ টাকা

বাজারের মাছ বিক্রেতা আবদুস সালাম জানান, সাগরে মাছ না পাওয়ায় সরবরাহ কম, তাই দাম কিছুটা চড়া।

​সরকারি প্রণোদনা ও অনিবন্ধিত জেলেদের সংকট

​জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, বরগুনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৮,৬০০ জন। এর মধ্যে সরকারি সুবিধার আওতায় আছেন ২৭ হাজার জেলে, যাদের ২৬ হাজার জন নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রণোদনা পান। তবে এর বাইরেও জেলায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা কোনো সরকারি সহায়তা পান না। সংকটের এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ও অনিবন্ধিত জেলেরা বেঁচে থাকার তাগিদে সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ মতামত: মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার বৈরিতা, নদীর নাব্যতা সংকট এবং সাগরে মাছের বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তনের কারণেই মূলত ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।


​প্রশাসনের বক্তব্য

​পাথরঘাটা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলে ও ট্রলার মালিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাগরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে জেলেরা আবার সাগরে যেতে পারবেন।

​বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, "জাটকা নিধন বন্ধ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার রোধ এবং প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মৎস্য বিভাগ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।"

​ইলিশের এই ভরা মৌসুমে মাছ না পাওয়ার এই হাহাকার শুধু একটি পেশার সংকট নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বড় ধাক্কা। এখন আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া এবং সরকারি বিশেষ সহায়তার দিকেই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন বরগুনার উপকূলীয় জেলেরা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad