গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ আইন দাবি, বিলম্বিত বিচারকে বিচারহীনতা বলছেন বক্তারা
মানবাধিকার ও স্বাধীন বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে “নিরেট ও স্বচ্ছ” আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, আইনজীবী, রাজনীতিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা বলেছেন, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আন্তর্জাতিক নিখোঁজ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত “ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা নিশ্চিতকরণ” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
“ফাঁকা বুলি নয়, কার্যকর আইন চাই”
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মানবাধিকার ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রশ্নে শুধু আশ্বাস বা বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রয়োজন। গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও তারা মত দেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে—যারা নির্দেশ দিয়েছেন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন—তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, গুমবিরোধী আইন যেন “ফাঁকা বুলি” না হয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামোতে রূপ নেয়।
তিনি আরও বলেন, সঠিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আরও জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে।
“বিলম্বিত বিচার মানেই বিচারহীনতা”
ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, জনগণকে আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভ্রান্ত করা যাবে না। তার মতে, গুমের শিকার পরিবারগুলোর আইনি স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের ধৈর্যকে দুর্বলতা হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না এবং সংসদীয় আলোচনার প্রতি আস্থা নষ্ট হলে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আজমী বলেন, বিলম্বিত বিচার প্রকৃত অর্থে বিচারহীনতার শামিল। কোনো সভ্য দেশে গুমকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“আইন দিয়ে গুম ঠেকানো যাবে না—এটি দুর্বল”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইন দিয়ে গুম প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বর্তমান কাঠামো দুর্বল এবং এতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
তিনি আরও বলেন, আইন এমন হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ গুমের মতো অপরাধ করতে না পারে।
“দায়মুক্তি থাকলে রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতি”
অধিকারের অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর তাসকিন ফাহমিনা বলেন, শক্তিশালী আইন ও কার্যকর সিস্টেম থাকলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে পারবে। দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যান্য বক্তারা
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক মানবাধিকার কমিশন সদস্য ডা. নাবিলা ইদ্রিস, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসাইন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীকসহ অন্যান্য অতিথিরা।
বক্তারা সবাই একমত হন যে, গুম প্রতিরোধে কঠোর আইন, দ্রুত বিচার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

মোঃ আল আমিন হোসেন,বার্তা সম্পাদক