গণমাধ্যমকর্মীরা ভোটাধিকার 'বঞ্চিত' কেনো?

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৫ সকাল
  • ২৪৮৪০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

গণমাধ্যমকর্মীরা ভোটাধিকার 'বঞ্চিত' কেনো?



গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নির্বাচনকে, আর সেই নির্বাচনের দর্পণ হিসেবে কাজ করে গণমাধ্যম। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ বিড়ম্বনার বিষয় হলো, যে সংবাদকর্মীরা দিনরাত এক করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সংবাদ প্রচার করেন, নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরেন এবং ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করেন— দিনশেষে সেই সংবাদকর্মীদের বড় একটি অংশ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অমীমাংসিত বৈষম্য। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পেশাজীবী এবং প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখলেও গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যা পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথে এক ধরণের নীরব বাধা এবং নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।


​একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের জন্য এই অধিকার প্রয়োগের পথ সুগম করা। বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় তারা সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত না হয়েও চিঠির মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তাদের রায় প্রদান করতে পারেন। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ যেহেতু ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং বা পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন, তাই তাদের জন্যও এই সুযোগটি উন্মুক্ত। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের। অথচ নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন কোনোভাবেই একজন সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম ব্যস্ততার নয়।


​নির্বাচনের দিন একজন সংবাদকর্মীকে কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে থাকতে হয়। কখনো এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে ছুটতে হয় সংবাদ সংগ্রহের জন্য, কখনো বা সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভ) প্রয়োজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সাংবাদিককে তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে শত মাইল দূরে অন্য কোনো জেলায় অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো হয়। এই বাস্তবতায় নিজের এলাকায় গিয়ে ভোট দিয়ে আবার কর্মস্থলে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। ফলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিবারই হাজার হাজার সাংবাদিক তাদের পবিত্র আমানত 'ভোট' দেওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এটি কেবল একজন ব্যক্তির অধিকার হরণ নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা।


​এই বৈষম্যটি আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি যে, রাষ্ট্র সাংবাদিকদের 'ফ্রন্টলাইনার' বা সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু অধিকারের প্রশ্নে তাদের পেছনে ফেলে রাখা হয়। নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিতে পারে যে, পোস্টাল ব্যালটের জন্য আগেভাগে আবেদন করতে হয় এবং নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই দাবিটি সংবাদকর্মীরা করে আসলেও কেন আজ পর্যন্ত তার আইনি সংস্কার বা বাস্তবায়ন হলো না? কেন নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের এই বাস্তব সমস্যাটিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে না? যদি সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে পারে, তবে বেসরকারি খাতে কর্মরত কিন্তু রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য কেন নয়?


​গণমাধ্যম কর্মীদের এই ভোটাধিকারহীনতা তাদের পেশাগত নিরপেক্ষতা বা মানসিকতায় কোনো প্রভাব না ফেললেও, এটি এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা তৈরি করে। একজন সাংবাদিক যখন দেখেন তিনি অন্য সবার ভোট দেওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছেন কিন্তু নিজের ভোটটি দিতে পারছেন না, তখন নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি তার একটি প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ জন্মানো অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া এটি বৈষম্যের একটি বড় দৃষ্টান্ত। কারণ নির্বাচনী আইনের মূল চেতনা হলো 'সার্বজনীন ভোটাধিকার'। যখন একটি নির্দিষ্ট পেশার বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের কর্মব্যস্ততার কারণে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তখন সেই নির্বাচন আর পুরোপুরি 'সার্বজনীন' থাকে না।


​বিদেশের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিকদের জন্য আগাম ভোট (Early Voting) বা পোস্টাল ব্যালটের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এমনকি পেশাগত কারণে যারা ভ্রমণে থাকেন বা জরুরি সেবায় নিয়োজিত থাকেন, তাদের সবার জন্যই ডিজিটাল বা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বাড়লেও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তার প্রতিফলন এখনো সীমিত। নির্বাচন কমিশন চাইলে খুব সহজেই সাংবাদিকদের জন্য নিবন্ধনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালট বা বিশেষ বুথের ব্যবস্থা করতে পারতো। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভোটার আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো দিন বা নির্দিষ্ট কোনো সময়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়।


​এই সমস্যার সমাধানে সংবাদপত্রের সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেলের কর্ণধার এবং সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোরও জোরালো ভূমিকার অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক সময় সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের ভোটের দিন ছুটি দিতে পারে না বা শিফট এমনভাবে সাজায় যে ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে মূল দায়টি নির্বাচন কমিশনের ওপরই বর্তায়। কমিশন যদি নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে গণমাধ্যম কর্মীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে, তবে আইনি জটিলতা দূর করা কেবল সময়ের ব্যাপার। সাংবাদিকদের এক্রিডিটেশন কার্ড দেওয়ার সময় বা নির্বাচন কাভার করার অনুমতি দেওয়ার সময়ই তাদের পোস্টাল ব্যালটের অপশন দেওয়া যেতে পারে।


​গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো অংশগ্রহণ। যে গণমাধ্যম নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে, সেই গণমাধ্যমের কর্মীদেরই যদি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এটি কেবল গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি অবহেলা নয়, বরং তাদের নাগরিক মর্যাদাকে খাটো করে দেখার শামিল। নির্বাচনের সংবাদ প্রচার করা যদি জাতীয় দায়িত্ব হয়, তবে ভোট দেওয়া তার চেয়ে বড় নাগরিক দায়িত্ব। একটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্যটি বিসর্জন দিতে হওয়া কোনো সুস্থ ব্যবস্থার পরিচয় হতে পারে না।


​আসন্ন নির্বাচনগুলোতে এই বৈষম্য নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সাংবাদিকদের কেবল সংবাদ সংগ্রাহক হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের সচেতন নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পোস্টাল ব্যালটের পরিধি বাড়িয়ে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, প্রতি নির্বাচনের পর আমরা উৎসবের কথা বলবো, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলবো, কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে যাবে হাজার হাজার সংবাদকর্মীর না দিতে পারা ভোটের দীর্ঘশ্বাস। এই বৈষম্য দূর না হলে নির্বাচনের সার্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এই নীরব বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সাংবাদিকদের তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। সংবাদকর্মীরা যেন বলতে পারেন, তারা কেবল অন্যের অধিকারের কথা লেখেন না, নিজের অধিকারটিও চর্চা করতে পারেন।


আলমগীর মোহাম্মদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক, চট্টগ্রাম।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad