পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানির আরেকটি চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় তিনটি লরিতে করে জ্বালানি নেওয়া হয়। এটি দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি সরবরাহের তৃতীয় চালান।
এর আগে সোমবার সকালে রাশিয়া থেকে ভারতের দিল্লি হয়ে জ্বালানিবাহী উড়োজাহাজ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। আভিয়াকন জিতোট্রান্স পরিচালিত এজেডএস-৬৭১৩ ফ্লাইটে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জ্বালানি বুঝে নেন।
বিশেষ নিরাপত্তায় পরিবহনমঙ্গলবার সকালে তিনটি লরিতে করে জ্বালানি ঢাকা থেকে রূপপুরের উদ্দেশে নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া হয়ে লরিগুলো প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। পথে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি এসআরবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
পুলিশ ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জ্বালানি পরিবহনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যানজট এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ সময় মহাসড়কে সাময়িকভাবে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
দ্বিতীয় ইউনিটে আরও জ্বালানি আসছেপ্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সাতটি কার্গোতে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রথম ইউনিটে ব্যবহৃত জ্বালানির নির্ধারিত অংশ প্রতিস্থাপনের জন্য দুটি কার্গোতে আরও ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া থেকে আরও সাতটি ফ্লাইটে ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। এসব চালান বিভিন্ন দেশের আকাশপথ ও পরিবহন রুট ব্যবহার করে দেশে পৌঁছাবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে।
এর আগে গত ২১ অক্টোবর দ্বিতীয় ইউনিটের দ্বিতীয় চালানের জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।
প্রথম ইউনিটে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষারূপপুরের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি স্থাপনের কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন কারিগরি জটিলতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি পিছিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমনব্যবস্থার নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় চলতি মাসে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভালভটির তৃতীয় দফার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনক্রমে ১১ অক্টোবর চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা হয় বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে ইউনিটটি ‘স্টেজ-সি’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী নভেম্বরেই প্রথম ইউনিটের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
দুই ইউনিটে উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটরূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছায়। ওই বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে আরও চারটি চালানে জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। চলতি বছরের মে মাসে প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। চুল্লির ব্যবহৃত জ্বালানির একটি অংশ নির্ধারিত সময় পরপর পরিবর্তন করতে হয়। এ কারণে প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির একটি চালান গত ৩ অক্টোবর রূপপুরে আনা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর রাশিয়া কেন্দ্রটির জ্বালানি সরবরাহ করবে। এরপর নির্ধারিত সময় পরপর জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশকে তা আমদানি করতে হবে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক