চীনের পরই তাঁবু রপ্তানিতে বাংলাদেশ, বাড়ছে বিদেশি বিনিয়োগ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৭ দুপুর
  • ২২৬০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের বাজারে চাহিদা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সম্ভাবনা; বড় বাধা আমদানিনির্ভর কাঁচামাল

তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার খাত হয়ে উঠছে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্প। বিশ্ববাজারে ক্যাম্পিং, ভ্রমণ, অ্যাডভেঞ্চার ও আউটডোর বিনোদনের পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছেন উদ্যোক্তারা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বাজারকে কেন্দ্র করে দেশে বাড়ছে বিদেশি বিনিয়োগও। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তাঁবু রপ্তানিতে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকংসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে তাঁবু, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, স্লিপিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক ও অন্যান্য আউটডোর সরঞ্জাম উৎপাদনে বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) এ শিল্পের উল্লেখযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

তবে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের বিকাশে বড় বাধা কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা। তাঁবু তৈরির বিশেষায়িত কাপড়, কোটিং, দড়ি, খুঁটি ও ফ্রেমের বড় অংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

৪৯ দেশে রপ্তানি, বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র

জাতিসংঘের বাণিজ্য পরিসংখ্যানভিত্তিক কমট্রেড ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী রপ্তানি করে প্রায় ২৩৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে এ খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৯টি দেশে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৮৭ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

এ ছাড়া ফ্রান্সে ২৮ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন, কানাডায় ১৯ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন, স্পেনে ১৯ দশমিক ১৭ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্যে ১৮ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের তাঁবু রপ্তানি হয়েছে।

রপ্তানি পণ্যের বড় অংশই সিনথেটিক ফাইবারের তাঁবু। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের তাঁবু রপ্তানির মূল্য ২২ কোটি ৭ লাখ ডলার। বাকি রপ্তানির মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, তারপলিন, ছাউনি, টেক্সটাইলের তাঁবু ও তাঁবুর পাল।

২০২৫ সালে বিশ্বে ক্যাম্পিং তাঁবুর বাজারের আকার প্রায় ৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগে বাড়ছে উৎপাদন সক্ষমতা

ইপিবির তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ইপিজেডগুলোতে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম উৎপাদনে বর্তমানে ১৪টি কারখানা সক্রিয় রয়েছে। গত দুই বছরে এ খাতে প্রায় আটটি নতুন বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে।

গত ২০ মে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও হংকংভিত্তিক সানশাইন আউটডোর বিডি কোং লিমিটেড তাঁবু ও ক্যাম্পিং পণ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে দেড় কোটি ডলার বিনিয়োগের জন্য জমি ইজারা চুক্তি করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পিএইচ ক্রিয়েটিভ বিডি লিমিটেড তাঁবুর ফ্রেম, ফাইবারগ্লাসের খুঁটি, স্লিপিং ব্যাগ, ক্যাম্পিং চেয়ার ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। হংকং-চীনভিত্তিক গ্রিন পিউর হাউসওয়্যার কোম্পানি গ্রিনহাউস ও হাইড্রোপনিকস টেন্ট উৎপাদনে প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এ ছাড়া ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেড প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার, তাইওয়ান-সমর্থিত ন্যাটওয়ে আউটডোর প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ ডলার এবং কুইন্ডা আউটডোর ১ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে বা কারখানা স্থাপন করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে বড় উৎপাদনকেন্দ্র

তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্পের অন্যতম বড় উৎপাদনকেন্দ্র চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী ইপিজেডে ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেডের তিনটি কারখানায় তাঁবু, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, ক্যানোপি ও অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ১২ কোটি ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাহিদা বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন করছে। সেখানে বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ পিস তাঁবু, ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, ক্যাম্পিং চেয়ার, ফার্নিচার, লাগেজ, স্লিপিং ব্যাগ ও গেজেবো উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী হং উ লি বলেন, বাংলাদেশ তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের শুরু থেকেই তাঁরা উল্লেখযোগ্য সুযোগ পেয়েছেন। বেপজার সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি ইনস্ট্যান্ট তাঁবু ও প্লাস্টিকের মোল্ড তৈরি করে এবং মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে। বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা পরিচালনা করায় দেশটি তাঁবু প্রস্তুতকারকদের জন্য আকর্ষণীয় উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন এইচকেডি ইন্টারন্যাশনালও এ খাতের উল্লেখযোগ্য উৎপাদক। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির ১১টি উৎপাদন লাইন রয়েছে। মাসে প্রায় তিন লাখ তাঁবু তৈরির সক্ষমতা নিয়ে তারা বিশ্বের ৩৩টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি আরও সাড়ে ৩ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁবুর পাশাপাশি ব্যাগ ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম

কর্ণফুলী ইপিজেডের অফমা ক্যাম্প লিমিটেড ক্যাম্পিংয়ে ব্যবহৃত হ্যামক, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ ও ঘোড়ার স্যাডল প্যাডসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে। বিশ্বের ২১টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ছিল ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলার। ফরাসি ক্রীড়া ও আউটডোর পণ্যের খুচরা বিক্রেতা ডিক্যাথেলন তাদের বড় ক্রেতাদের একটি।

দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন পার্ক বাংলাদেশ ট্রাভেল ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, নারীদের ব্যাগ ও সার্ফিং ব্যাগসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ছয় লাখ ব্যাগ তৈরি করছে। সর্বশেষ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উৎপাদিত ব্যাগের প্রায় ৮০ শতাংশ নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি করা হয়। সেখান থেকে এসব পণ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিতরণ করা হয়। এশিয়াসহ অন্যান্য বাজারেও পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, দেশের ইপিজেডগুলো এখন শুধু তৈরি পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাইকেল, ব্যাগ, ফার্নিচার, তাঁবু, তাঁবুর আনুষঙ্গিক উপকরণ, সেফটি শু ও ফ্যাশন শু উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে।

কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ

তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্পে রপ্তানি বাড়লেও কাঁচামালের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পলিয়েস্টার ও নাইলন ফেব্রিক, পিইউ ও সিলিকন কোটিং, পলিয়েস্টার মেশ, নাইলন-পলিয়েস্টারের দড়ি, ফ্রেম ও খুঁটির মতো উপকরণ আমদানি করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।

ক্যাম্পভ্যালির বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক কামার উল হক বলেন, তাঁদের ব্যবহৃত কাঁচামালের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

তিনি বলেন, এসব কাঁচামাল দেশে উৎপাদন করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে কম সময়ে বেশি পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কুমিল্লায় এ ধরনের একটি কারখানা স্থাপনের কাজও চলছে বলে জানান তিনি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয়ভাবে বিশেষায়িত কাপড়, ফ্রেম, খুঁটি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ উৎপাদন করা গেলে এ শিল্পে দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জামের মতো প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad