এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু নথিপত্র উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
৪৫ দরপত্রের ৩০টিতে একক দরদাতাএনসিটিবির দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করে যুগান্তর জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহের ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একজন করে দরদাতা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। ১৩টি দরপত্রে দুটি করে এবং বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মালিকের অনুরোধে দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত শিক্ষাবর্ষে কোনো দরপত্রে একক দরদাতা না থাকলেও এবার প্রতিযোগিতার চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান যুগান্তরকে বলেন, এবার পাঠ্যবইয়ের দরপত্রে কার্যকর প্রতিযোগিতা হয়নি। এনসিটিবির কর্মকর্তা ও কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সরকারের শত শত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফর্মাপ্রতি মুদ্রণমূল্য বেড়েছে ৪৩.৭ শতাংশদরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সায়। অর্থাৎ ফর্মাপ্রতি গড় মুদ্রণমূল্য বেড়েছে প্রায় ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং প্রাক্কলিত মূল্য পুনর্নির্ধারণের কারণে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এতে দরপত্রের স্বচ্ছতা ও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ বণ্টনের অভিযোগযুগান্তরের প্রতিবেদনে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ বণ্টন ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণে একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ তুলে কয়েকজন মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেল, দুলাল সরকার, এসএম মহসিন, মিন্টু মোল্লা, হুমায়ুন কবির, শেখ সিরাজ, পারভেজ ও সুহেলের নাম রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চক্রটি ইতোমধ্যে এনসিটিবির প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রমা ও ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক এসএম মহসিন যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবিতে কোনো সিন্ডিকেট নেই এবং এবার তিনি খুব বেশি কাজ পাননি। অনিয়মের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রায় ১২০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকুসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দরপত্রে অনিয়ম, গোপন দর ফাঁস ও প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে জানিয়েছে যুগান্তর।
অন্যদিকে, এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁরা যথাসময়ে বই সরবরাহের চেষ্টা করছেন।
নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিয়েও শঙ্কাচুক্তি অনুযায়ী, ৪০ দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান থাকলেও সরবরাহের সময়সীমা তুলে দিতে এনসিটিবির ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের ৩৩৭ ও ৪০৪ নম্বর লট এবং মাধ্যমিক স্তরের ৬৭১ নম্বর লটে কাওসারুজ্জামান রুবেলের মালিকানাধীন অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস অংশ নেয়। পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি তুলনামূলক বেশি দর দিয়ে কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য প্রায় তিন কোটি বই মুদ্রণের কাজ বরাদ্দ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কয়েকটি দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ৯২১, ৯৩২, ৯৪৫, ৯৪৭ ও ১০১২ নম্বর লটে ৩১ থেকে ৩৪টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের দরপত্রের সঙ্গে পরবর্তী দরপত্রের তুলনা করলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
দুই হাজার কোটি টাকার বই ছাপানোর কাজএনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। এ কাজে সরকারের ব্যয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
এদিকে, নিম্নমানের বই ছাপানোর অভিযোগে ২০টির বেশি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি। বই সরবরাহের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি তদারকি বাড়িয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং মুদ্রণকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বিপুল সরকারি ব্যয়ের এ কর্মসূচিতে দরপত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ১৮ অক্টোবর ২০২৬; এনসিটিবির দরপত্র ও ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত। অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
বিভাগ: জাতীয় / শিক্ষা

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার