চট্টগ্রামে প্রাণীর কঙ্কাল জাদুঘর, প্রধান আকর্ষণ বিশাল জিরাফ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৯ দুপুর
  • ৬৪৯৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
প্রবেশপথ পেরোতেই চোখে পড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক জিরাফের কঙ্কাল। পাশেই হাতি, উট, কুমির ও অজগরের কঙ্কাল। কাচের পাত্রে রাসায়নিক দ্রবণে সংরক্ষিত রয়েছে চোখ, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি ও জরায়ুর মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। আছে প্রাণীর মডেল, ভ্রূণ, টিস্যু ও কোষের নমুনাসহ মাইক্রোস্কোপের হাজারো স্লাইড।

দূর থেকে জায়গাটিকে কঙ্কালের জগৎ মনে হলেও ভেতরে রয়েছে প্রাণীদেহের গঠন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম ও জীববিজ্ঞানের নানা রহস্য জানার সুযোগ। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) অ্যানাটমি মিউজিয়াম হয়ে উঠেছে ভেটেরিনারি শিক্ষার্থী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমী এক শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউসুফ চৌধুরী ভবনের নিচতলায় প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে। পরে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা ও মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

জিরাফের কঙ্কাল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ

জাদুঘরের প্রবেশমুখে রাখা জিরাফের কঙ্কালটি দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ গলা ও সুউচ্চ অবয়বের এই কঙ্কাল সংগ্রহ ও পুনর্গঠনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় জিরাফটি মারা যায়। পরে প্রায় ছয় মাস মাটিতে পুঁতে রাখার পর এর হাড় সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় অস্থিগুলো পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করে চট্টগ্রামে আনা হয়। এরপর সিভাসুর অ্যানাটমি ও হিস্টোলজি বিভাগে একেকটি হাড় শনাক্ত করে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল তৈরি করতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগে। এ কাজে ব্যয় হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষের মতে, জিরাফের মতো বড় প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল সংগ্রহশালাটির বিশেষ আকর্ষণ। এটি শিক্ষার্থীদের প্রাণীর অস্থিকাঠামো সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

হাতি, উট, কুমির ও অজগরের কঙ্কাল

জিরাফের পাশেই রয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া সাফারি পার্ক থেকে সংগ্রহ করা হাতির কঙ্কাল। ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে আনা হয়েছে উটের কঙ্কাল। এ ছাড়া সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে মৃত অবস্থায় পাওয়া একটি বিশাল অজগর এবং ময়মনসিংহের ভালুকা কুমির প্রজনন কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা বড় আকৃতির কুমিরের কঙ্কালও প্রদর্শিত হচ্ছে।

জাদুঘরে মানুষের কঙ্কালও রয়েছে, যা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের ইউএসটিসি থেকে সংগ্রহ করা মানবশিশুর একটি দেহ ফরমালিনভর্তি পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব নমুনা মানবদেহ ও প্রাণীর গঠনগত বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছে।

কাচের পাত্রে ৫০০ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

এ জাদুঘরে শুধু কঙ্কাল নয়, প্রাণীদেহের অভ্যন্তরীণ গঠন তুলে ধরতে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ৫০০টি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। মানবদেহের চোখ, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, জরায়ু ও স্তনের নমুনার পাশাপাশি কুকুর, বিড়াল, শূকর, গরু ও মুরগির বিভিন্ন অঙ্গ রাখা হয়েছে রাসায়নিক দ্রবণে।

এ ছাড়া রয়েছে ডিএনএ ও ক্রোমোজমের নমুনা, ছাগল, শূকর ও খরগোশের ভ্রূণ এবং বিভিন্ন প্রাণীর টিস্যু ও কোষের গঠন দেখার জন্য মাইক্রোস্কোপের স্লাইড। এসব নমুনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বইয়ের ছবি ও তাত্ত্বিক পাঠের বাইরে বাস্তবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান, গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।

জাদুঘরের দেয়ালে প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গ, দেহতন্ত্র ও শারীরবৃত্তীয় গঠনের চিত্রের পাশাপাশি জীববিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের প্রতিকৃতিও রয়েছে।

প্রাণীকে জীবন্ত মনে হয় যেভাবে

জাদুঘরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ প্রাণী ও পাখির স্ট্যাফ। মোরগ, মুরগি, রাজহাঁস, কবুতর, কাঠঠোকরা, দোয়েল, প্যাঁচা, মাছরাঙা, তিতির, কোয়েল, খরগোশ, গিনিপিগ, কচ্ছপ, অজগর, গোখরা, বাদুড় ও হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণীর নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

স্ট্যাফিং পদ্ধতিতে মৃত প্রাণীর চামড়া ও দেহাবশেষ বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হয়। এরপর তুলা, রড ও জিআই তারের সাহায্যে প্রাণীটির স্বাভাবিক অবয়ব তৈরি করে তার ওপর চামড়া বসানো হয়। ফলে নমুনাগুলোকে অনেকটা জীবন্ত প্রাণীর মতো দেখায়।

শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

সিভাসুর অ্যানাটমি অ্যান্ড হিস্টোলজি বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ জাদুঘরে প্রায় ৬০টি কঙ্কাল, ৩০টি স্ট্যাফ, ২ হাজার অস্থি, ৭৫টি মডেল এবং প্রায় ৩ হাজার মাইক্রোস্কোপিক স্লাইড রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে।

জাদুঘরটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা সিভাসুর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, এখানে বিভিন্ন গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাসে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করে। প্রাণীদেহের অঙ্গ ও দেহতন্ত্রের অবস্থান, গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়াই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।

তিনি জানান, জিরাফের কঙ্কাল যুক্ত হওয়ায় জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সৃষ্টি এবং এ পেশার উন্নয়নেও সংগ্রহশালাটি ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, ছোট প্রাণীর কঙ্কাল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয়। বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রথমে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। দুই থেকে তিন মাস পর মাংস পচে গেলে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হাড় পরিষ্কার করে সেগুলো জোড়া লাগানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরাও একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাদুঘর পরিদর্শনে আসা মো. রাশেদ বলেন, একসঙ্গে এত ধরনের প্রাণীর কঙ্কাল ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখার অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে জিরাফের কঙ্কালটি খুবই আকর্ষণীয়। বইয়ে পড়া বিষয়গুলো এখানে বাস্তবে দেখে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, বইয়ের ছবির চেয়ে সরাসরি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখলে সেগুলোর গঠন ও অবস্থান সহজে বোঝা যায়। এতে পড়াশোনার বিষয়গুলোও দীর্ঘদিন মনে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা এখানে গবেষণা ও ইন্টার্নশিপের জন্য আসেন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রায় ১০টি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাণীর কঙ্কাল সাধারণত মৃত্যুর স্মারক হিসেবে বিবেচিত হলেও সিভাসুর অ্যানাটমি মিউজিয়ামে তা জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্য উপকরণে রূপ নিয়েছে। জিরাফের দীর্ঘ গলা, হাতির বিশাল অস্থি কিংবা কুমিরের চোয়াল—প্রতিটি নমুনা প্রাণীর দেহগঠন ও বৈচিত্র্য বোঝার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মাইক্রোস্কোপিক স্লাইড শিক্ষার্থীদের সামনে উন্মোচন করছে প্রাণীদেহের জটিল কর্মপ্রক্রিয়া।

তথ্যসূত্র: বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্লিখিত।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad