ধূমপান না করেও ফুসফুসে ক্যানসার, ঝুঁকিতে যারা

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫১ রাত
  • ২৪৩৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

পারিবারিক ইতিহাস এবং পরিবেশগত সংস্পর্শ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ছবি: ফক্স নিউজ

ধূমপান করেন না, এমন ব্যক্তিরও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। বংশগত বৈশিষ্ট্য, বিরল জিনগত পরিবর্তন ও পরিবেশের বিষাক্ত উপাদান এ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সম্প্রতি ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিও। তার ধূমপানের অভ্যাস বা অতীতে ধূমপানের ইতিহাস জানা যায়নি। অস্ত্রোপচারের পর টিস্যু পরীক্ষায় তার ক্যানসার শনাক্ত হয়। তার অসুস্থতা আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ধূমপান না করেও কেন ফুসফুসের ক্যানসার হয়, আর কারা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে?

ভ্যাটিকান মঙ্গলবার জানায়, নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের পর পোপের ফুসফুসে অ্যাডেনোকার্সিনোমা শনাক্ত হয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় তার ডান ফুসফুসের নিচের খণ্ডটি অপসারণ করা হয়। পরে ওই টিস্যু পরীক্ষা করে ক্যানসার নিশ্চিত করা হয়। অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষাতেও ক্যানসারের সন্দেহ দেখা দিয়েছিল বলে জানিয়েছে হলি সি প্রেস অফিস।


যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী ধূমপান। তবে ধূমপানই এ রোগের একমাত্র কারণ নয়। কখনো ধূমপান করেননি, এমন ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হন।


যুক্তরাষ্ট্রের লাং ক্যানসার ফাউন্ডেশন অব আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ফুসফুসের ক্যানসারের প্রায় ৪০ শতাংশই অ্যাডেনোকার্সিনোমা। ধূমপান করেন না, এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও এটি ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন।


যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত মোফিট ক্যানসার সেন্টারের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ল্যারি রবিনসন ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশ ধূমপায়ী অথবা অতীতে ধূমপান করেছেন। তবে কখনো ধূমপান করেননি, এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও এ রোগ দেখা যায়। তাদের মধ্যে আক্রান্ত পুরুষের হার আনুমানিক ১০ শতাংশ এবং নারীর হার ২৫ শতাংশ।


পোপের চিকিৎসা করেননি রবিনসন। তবে তার মতে, পোপের ফুসফুসে পাওয়া গাঁটটি ক্যানসারযুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফুসফুসের একটি খণ্ড অপসারণের সিদ্ধান্ত থেকে ধারণা করা যায়, রোগটি সম্ভবত একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ ছিল।


ক্যানসার প্রথম পর্যায়ে থাকলে নিরাময়ের সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ হতে পারে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তবে তা টিউমারের আকারের ওপর নির্ভর করে। পোপের ক্যানসার কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পর আরো চিকিৎসা লাগবে কি না, তা জানতে টিস্যুর বিস্তারিত পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হবে।


রবিনসনের মতে, টিউমার যত বড় হয়, ক্যানসার অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছানো বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তত বাড়ে।


ধূমপান ছাড়াও যেসব কারণে বাড়ে ঝুঁকি


ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি শুধু ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত পরিবর্তন এবং পরিবেশের বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শও এ রোগের কারণ হতে পারে।


সম্প্রতি সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইজিএফআর টি৭৯০এম নামের একটি বিরল জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিবর্তন থাকা ব্যক্তিদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ২৫ গুণ বেশি।


যারা কখনো ধূমপান করেননি, তাদের মধ্যে এই জিনগত পরিবর্তন থাকা ব্যক্তিদের ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা পরিবর্তনটি নেই—এমন ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ৬২ গুণ বেশি।


এ ছাড়া সিগারেটের পাশাপাশি পাইপ ও চুরুটের মতো তামাকজাত দ্রব্য সেবন এবং অতিরিক্ত গাঁজা সেবনও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে জানান রবিনসন। ডিজেলচালিত যানবাহনের ধোঁয়া ও রেডনের মতো পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শও ঝুঁকির কারণ।


ধূমপান করেন না, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রোগটি অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হয়। রবিনসনের ভাষ্য, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত অধূমপায়ীদের অর্ধেকের বেশি রোগী চতুর্থ পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। ধূমপায়ী বা সাবেক ধূমপায়ীদের তুলনায় তাদের রোগ শনাক্তের সময় অবস্থা বেশি জটিল হতে পারে।


যেসব লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না


ফুসফুসের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে রোগটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে লক্ষণ দেখা দিলে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সঙ্গে রক্ত বের হওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।


কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার মতো স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান রবিনসন।


তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার তুলনামূলক বিরল। তাই সবার জন্য নিয়মিত সিটি স্ক্যানের সুপারিশ করা হয় না। তবে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ৫০ বছর বয়স থেকে প্রতিবছর সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তের পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।


উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান ধূমপায়ী, যাদের ধূমপানের ইতিহাস অন্তত ২০ প্যাক-ইয়ার। প্যাক-ইয়ার দিয়ে ধূমপানের পরিমাণ ও সময়কাল বোঝানো হয়। যেমন—২০ বছর ধরে প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট খাওয়া বা ১০ বছর ধরে প্রতিদিন দুই প্যাকেট খাওয়া—দুটিই ২০ প্যাক-ইয়ারের সমান। এ ছাড়া যারা গত ১৫ বছরের মধ্যে ধূমপান ছেড়েছেন, তারাও উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে পড়েন।


রবিনসন বলেন, পরীক্ষার যোগ্য ব্যক্তিদের মাত্র ১৫ শতাংশের মতো নিয়মিত এ পরীক্ষা করান। ফলে ঝুঁকিতে থাকা অনেকেরই সময়মতো রোগ শনাক্ত হচ্ছে না।


তবে ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তের প্রক্রিয়া আরো সহজ হতে পারে বলে আশা করছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার প্রত্যাশা, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে চিকিৎসকের কাছে রক্ত পরীক্ষায় ক্যানসারের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর তা নিশ্চিত করতে সিটি স্ক্যান করা সম্ভব হবে। এতে পরীক্ষা করানো সহজ হবে এবং আরো বেশি রোগীর ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যেতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad