তালিকায় ১,৩৮৭ ছিনতাইকারী, গ্রেপ্তারেও থামছে না অপরাধ

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি : এআই দিয়ে তৈরি I
রাজধানীতে সক্রিয় অপরাধীদের বড় অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে, জামিনে বেরিয়ে ফের ছিনতাইয়ের অভিযোগ

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অপরাধীদের তৎপরতা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় নাম রয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও আছে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তালিকা ও অপরাধের পরিসংখ্যানে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তালিকাভুক্ত অপরাধীদের পাশাপাশি নতুন একটি অংশও ছিনতাইয়ে যুক্ত হচ্ছে। ফলে রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭। ছয় মাস আগে এ সংখ্যা ছিল ৯৮৯। অর্থাৎ, ছয় মাসের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৯৮ জন, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, অপর একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ৯৭৯ ছিনতাইকারীর তালিকা করেছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের ৪৬৬টি হটস্পটে ৯৬৯ সক্রিয় ছিনতাইকারী পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

ওয়ারী বিভাগে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে বেশি

ডিএমপির আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী তালিকাভুক্ত রয়েছে ওয়ারী বিভাগে—৩০৮ জন। তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে, মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুর বিভাগে ৫৩ জন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে এক থেকে সাতটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। তবে মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও অপরাধে ফিরে আসার প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। অপরাধীদের একটি অংশ ছুরি, চাপাতি ও সামুরাইয়ের মতো দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করছে। কোথাও কোথাও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন করছে।

বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় থাকা ৯৭৯ জনের মধ্যে মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ২১২ জন, মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬, উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৬৪ এবং রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২৮৭ জন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

৪৬৬ হটস্পটে সক্রিয় ছিনতাইকারী

পুলিশের বিশেষ শাখা ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের ৪৬৬টি এলাকায় ৯৬৯ সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে, যারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকার দেড় শতাধিক স্থান ছিনতাইকারীদের নিয়মিত বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বাসস্ট্যান্ড, বাজার, সড়কের মোড় এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোতেও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ছিনতাইয়ে জড়িতদের মধ্যে ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ রয়েছে। সুযোগ বুঝে তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পথচারী ও যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। নতুন অপরাধী যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা কম, প্রকৃত চিত্র অজানা

বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এসবির ক্রাইম ডেটাবেস অনুযায়ী, গত মে মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ৩৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে এ ধরনের ১৬৭টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিএমপির ৫০ থানায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ২৫টি, মার্চে ২৯টি, এপ্রিলে ২৬টি এবং মে মাসে ৩৬টি মামলা হয়।

তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে চান না। ফলে অনেক ঘটনা সরকারি নথিতে উঠে আসে না। এতে অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা ও বিস্তৃতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এলাকাভিত্তিক তালিকায় বহু নাম

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তালিকায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ছিনতাইয়ে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তালিকায় পূর্বাঞ্চল, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, রামপুরা, সবুজবাগ, মুগদা, মিরপুর, শাহ আলী, পল্লবী ও কল্যাণপুর এলাকার একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তালিকায় নাম থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

জামিনে মুক্তির পর ফের অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, চুরি-ছিনতাইকে এখন আর সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব অপরাধে জড়িতদের অনেকে পেশাদার এবং তারা মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর সহজে জামিন পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে আইনি সংস্কার প্রয়োজন। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের বক্তব্য

ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে চ্যালেঞ্জ এবং অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগে জানতে চাওয়া হলে আমার দেশকে দেওয়া জবাবে বলা হয়, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

জবাবে আরও বলা হয়, পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়। অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, তাঁর কাছে ছিনতাইকারীদের কোনো তালিকা নেই। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ডিএমপি নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে প্রতিদিনই ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হচ্ছে। গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যানও দেওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad