হামলার আগে পুলিশের ভূমিকা কোথায়, চট্টগ্রামে বারবার একই চিত্র

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৭ দুপুর
  • ১৭০৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামে একের পর এক প্রকাশ্য গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধের পর পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও হামলার মুহূর্তে পুলিশের প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও হামলার আগে পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে, কোথাও পুলিশের পাহারায় থাকা বাড়িতে হামলা হয়েছে, আবার কোথাও পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের কয়েকশ মিটারের মধ্যে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পরে মামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও হামলার সময় পুলিশ কোথায় ছিল—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

সর্বশেষ এর একটি উদাহরণ ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ দিবাগত রাতের ঘটনা। প্রায় আধঘণ্টা ধরে কয়েকটি মোটরসাইকেলে থাকা অস্ত্রধারীরা একটি প্রাইভেটকারকে ধাওয়া করে। প্রায় দুই কিলোমিটার ধাওয়ার পর বাকলিয়া এক্সেস রোডে গাড়িটি থামিয়ে গুলি করে পালিয়ে যায় তারা। এতে দুজন নিহত ও দুজন আহত হন। ঘটনাস্থলের কাছেই পুলিশের টহল গাড়ি থাকলেও হামলা ঠেকাতে পুলিশ এগিয়ে যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর পুলিশ তৎপর হয়।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় গত দুই বছরে এমন একাধিক ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নগর ও জেলায় অন্তত ৩৫ জন খুন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২ জন গুলিতে নিহত। এ সময়ে ৪০টির বেশি গুলির ঘটনাও ঘটেছে। অক্সিজেন, বালুচরা, হামজারবাগ, চন্দনপুরা, চান্দগাঁও, বাদুরতলা, খুলশী, বর্মা কলোনি, বাকলিয়া, কালুরঘাট, রাউজান ও সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে।

অধিকাংশ ঘটনায় মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল দেখা গেছে।

আধঘণ্টা ধাওয়া, কাছেই ছিল টহল পুলিশ

২০২৫ সালের ২৯ মার্চ রাতে শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেলে থাকা অস্ত্রধারীরা একটি প্রাইভেটকারকে ধাওয়া করে। প্রায় দুই কিলোমিটার পর বাকলিয়া এক্সেস রোডে গাড়িটিতে গুলি চালানো হয়। এতে চালকসহ দুজন নিহত ও দুজন আহত হন। শেষ পর্যায়ে ছয় অস্ত্রধারীকে মোটরসাইকেলে দেখা যায়। গুলি চালিয়ে তারা দ্রুত সরে যায়।

ঘটনার সময় এলাকায় পুলিশের টহল ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া এবং গুলির শব্দের পরও হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থাৎ অপরাধের পর তদন্তে তৎপরতা থাকলেও অপরাধ সংঘটনের সময় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছিল কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পুলিশের মনোবল ও সমন্বয়ের ঘাটতি, সক্রিয় সোর্স ও গোয়েন্দা তথ্যের অভাব, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং পুলিশ-জনগণের পারস্পরিক অনাস্থা এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, ফেরারি ও চিহ্নিত আসামিদের প্রকাশ্যে ফিরে আসাও আধিপত্য বিস্তার ও অরাজকতার সুযোগ তৈরি করছে।

আগাম সতর্কতার পরও সংঘর্ষ

২০২৫ সালের ২৭ ও ২৮ অক্টোবর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এতে সাজ্জাদসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে সাজ্জাদ (২২) মারা যান।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের দাবি, সংঘর্ষের প্রায় এক ঘণ্টা আগে তিনি পুলিশ কমিশনারকে ফোন করে এলাকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, এর কয়েক দিন আগ থেকেই তিনি বাকলিয়া থানার ওসিকেও বিষয়টি জানিয়েছিলেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, আগাম সতর্কতার পরও সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড ঠেকানো না গেলে সেটিকে শুধু অপরাধের পর তদন্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মতে, সম্ভাব্য সংঘর্ষের আগে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রতিরোধমূলক পুলিশি কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুলিশের পাহারায় থাকা বাড়িতেও হামলা

নগরের চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে অস্ত্রধারীরা গুলি চালায়। এর আগে ২ জানুয়ারি একই বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় বাড়িটিতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছিল। এরপরও হামলাকারীরা বাড়ির পেছন দিক থেকে এসে দ্বিতীয় দফায় গুলি চালানোর সুযোগ পায়।

মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে খবর পেয়ে পাহারায় থাকা পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য দোতলায় উঠে প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই হামলাকারীরা পিস্তল ও চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়ে চলে যায়।

অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পুলিশ পাহারায় থাকা একটি বাড়িতে হামলা ঠেকাতে না পারা পুলিশের প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

তদন্তকেন্দ্রের কাছেই দুই হত্যাকাণ্ড

রাউজানের পূর্ব গুজরায় গত ৫ জানুয়ারি রাতে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদারকে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। কয়েক সপ্তাহ পর ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় একই এলাকার অলিমিয়াহাটে আরেক যুবদল কর্মী আবদুল মজিদও একই কৌশলে হত্যার শিকার হন। দুটি ঘটনাস্থলই পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের কাছাকাছি।

এর আগে গত বছরের ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় হাটহাজারীর মদুনাঘাটে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আবদুল হাকিমের প্রাইভেটকার অনুসরণ করে অস্ত্রধারীরা। পানি শোধনাগারের গেটের সামনে গাড়িটি থামিয়ে তাঁকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত হাকিম হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। তাঁর চালকও গুলিবিদ্ধ হন। পরে গাড়িতে ২২টি গুলির চিহ্ন এবং দুই চাকা ফুটো হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

হামলার স্থানটি মদুনাঘাট পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে মাত্র ৬০০ ফুট দূরে ছিল। ঘটনার পর চারজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলেও হামলার সময় পুলিশের প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল বলেন, তদন্তকেন্দ্রের এত কাছে কয়েক মিনিট ধরে ২২টি গুলি চালানোর ঘটনা পুলিশের উপস্থিতি ও প্রতিরোধক্ষমতারও পরীক্ষা ছিল।

পুলিশের বক্তব্য

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও ডিসি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. রইছ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে ফোন ও এসএমএস করা হলেও তাঁদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ অভিযোগটি নাকচ করে বলেন, পুলিশ আগাম ব্যবস্থা নিতে পারেনি—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘পুলিশ যখনই খবর পেয়েছে, সব সময় ঘটনাস্থলে গেছে। কাল্পনিক কোনো কথা না বললেই ভালো।’

এসপি মাসুদ আলমও বলেন, পুলিশ শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেয়—এ বক্তব্য সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের দুটি দায়িত্ব—তদন্ত ও প্রতিরোধ; দুটিই একসঙ্গে করা হচ্ছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে দাবি করে তিনি ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াস ও গলাকাটা মোবারকের মতো আলোচিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেদিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।

৪০টির বেশি গোলাগুলি

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামে ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এসবের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত বিরোধসহ বিভিন্ন কারণের কথা উঠে এসেছে। তবে হামলার ধরনে বেশ কিছু মিল রয়েছে—মোটরসাইকেল ব্যবহার, হেলমেট বা মুখোশে পরিচয় আড়াল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে হামলা চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া।

গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের চালিতাতলীতে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি প্রচারের সময় গুলিতে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নিহত হন। এ ঘটনায় এরশাদ উল্লাহসহ দুজন আহত হন। এর আগে ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডের হামলা থেকে সরোয়ার বেঁচে গিয়েছিলেন, যে ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আগের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি পুলিশের বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন ছিল। পরে পুলিশ ও র‍্যাব তদন্ত করে আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা করে। র‍্যাবের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষিত শুটার ব্যবহারের তথ্যও উঠে আসে।

মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের মতে, এ ধরনের হামলার আগে অস্ত্র সংগ্রহ, লোকবল নির্ধারণ, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান জানা এবং পালানোর পথ ঠিক করার মতো প্রস্তুতি থাকে। ফলে এসব হামলার অনেকগুলোই আকস্মিক নয়। তাঁর প্রশ্ন—এই প্রস্তুতির তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছায় কি না এবং পৌঁছালে কতগুলো হামলা প্রতিরোধ করা হয়েছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad