গত কয়েক দিনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এরপর ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসসহ কয়েকটি যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ।
যাত্রাবাড়ীতে চারজন গ্রেপ্তার১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় অটোরিকশাচালক আহত হন। এ ঘটনায় তদন্ত করে রায়হান উদ্দিন, রাসেল খান, আলাউদ্দিন ও আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার রায়হান বংশাল এলাকার আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে রায়হানকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ঘটনার পেছনে আর কারা জড়িত এবং উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজধানীতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর মালিবাগে দুটি এবং পরে মহাখালী এলাকায় একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পরদিন যাত্রাবাড়ীতে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি মিরপুর, মধ্য বাড্ডা ও কেরানীগঞ্জে পৃথক যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মিরপুরে একটি বাসে আগুন দেওয়া হলেও তা ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কেরানীগঞ্জে পুলিশের জব্দ করা একটি পিকআপ এবং মধ্য বাড্ডায় একটি স্টাফ বাসেও আগুন দেওয়া হয়।
২০ সেপ্টেম্বর পল্লবীর সিরামিক রোডে একটি বাসে আগুন এবং রাজধানীর পৃথক স্থানে আরও দুটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ ২৭৬টি চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি বাড়ায়।
এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়।
ডিবির দাবি, শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনাডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। তবে এ দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াসাম্প্রতিক অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাকে আওয়ামী লীগের পুরোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তারা এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাতের আঁধারে ককটেল বিস্ফোরণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা কয়েকটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের অভিযোগ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সমালোচনা করে বলেন, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালাও-পোড়াও ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বানরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো সব রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে যেকোনো অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগে জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি এবং জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স