আসিফ মাহমুদ ও স্ত্রীর দেশ-বিদেশের সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১২ দুপুর
  • ৫০৪৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও বিদেশে বিনিয়োগের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচার এবং শেল কোম্পানি গঠনের অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।

দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠিতে বিএফআইইউকে আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ও সম্পদসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও নথি সরবরাহের অনুরোধ করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চিঠিতে দেশের সব ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নামে থাকা চালু, সুপ্ত ও বন্ধ হিসাবের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস এবং ঋণসংক্রান্ত নথিপত্রও চেয়েছে দুদক।

এ ছাড়া পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচার ও শেল কোম্পানি গঠনসংক্রান্ত দলিল-রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ওই দেশগুলোতে তাঁদের কোনো ব্যাংক হিসাব বা বিনিয়োগ রয়েছে কি না, সে তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

একাধিক অভিযোগে অনুসন্ধান

দুদকের চিঠিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং বিদেশে শেল কোম্পানি গঠনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মো. জাহেদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি দুদকে জমা পড়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য ও অর্থপাচারসহ নতুন অভিযোগের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। যাচাই-বাছাই শেষে এসব অভিযোগ আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পাঁচ দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

নতুন অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নেকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ মূলধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালত বা অনুসন্ধানের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে।

নিয়োগ ও প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

দুদক সূত্রে জানা গেছে, নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।

নিজ এলাকায় প্রকল্প বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থের বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, হোটেল ওয়েস্টিনসহ বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও যাঁদের নাম

দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে।

অন্যদিকে, গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন আসিফ মাহমুদ। ওই বক্তব্যে তাঁর মানহানি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়।

এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্য, বিএফআইইউকে দেওয়া দুদকের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad