স্থানীয় সূত্র জানায়, অর্ধশত বছর আগেও নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার নারী বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা পৈতৃক পেশা ধরে রেখে ৩০ থেকে ৪০ ধরনের শৌখিন ও গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিকের তৈরি পণ্য বাজার দখল করায় বাঁশশিল্পের চাহিদা কমেছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এ শিল্পের সংকট বাড়িয়েছে।
নেছারাবাদে কমেছে বাঁশশিল্পবিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও নেছারাবাদ উপজেলার ১৩৭টি গ্রামের মধ্যে ৪৬টি বাঁশশিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে ২৬টি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে টিকে আছে ২০টি। স্বরূপকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর সুবিধাবঞ্চিত দুটি বাঁশশিল্পও প্রায় নয় বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
সারেংকাঠির বাঁশশিল্পের মালিক শিলা হালাদার বলেন, ‘বাপ-দাদার এ পেশায় এখনো আছি। আর কয়দিন টিকে থাকতে পারব, তা জানি না।’
তিনি জানান, বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বাঁশের অপ্রতুলতা, প্লাস্টিক পণ্যের দখল এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
প্রায় পাঁচ যুগ আগেও গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই গৃহস্থালি কাজে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য ব্যবহৃত হতো। এখন সেসব পণ্যের জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক সামগ্রী।
২০ গ্রামে ৭ হাজার নারীশ্রমিকনেছারাবাদের করফা, সারেংকাঠি, গয়েসকাঠি, ভরতকাঠি, কাটাপিটানিয়া, জিরবাড়ি, খেজুরবাড়ি, লেবুবাড়ি, চিলতলা, রাজাবাড়ি, দেবদাসকাঠি, ব্যসকাঠিসহ ২০টি গ্রামে পাঁচ শতাধিক নারীপ্রধান পরিবারের প্রায় ৭ হাজার নারীশ্রমিক বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এসব পরিবারের প্রধান উপার্জনের উৎসই এ শিল্প।
গ্রামগুলোর অনেক বাড়িই এখনো যেন ছোট ছোট বাঁশশিল্প কারখানা। বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নারীরা সারিবদ্ধভাবে বসে বাঁশের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। পরিবারের ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনার ফাঁকে মাকে কাজে সহযোগিতা করে।
চিলতলা গ্রামের বৈরাগী সেতু শিকদার বলেন, ১৩ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। চার সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে বাঁশের চটি ও বেতি তৈরি করেন। এ কাজের আয় দিয়েই সন্তানদের মধ্যে তিনজনের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে।
জিরবাড়ির বাঁশশিল্পের কারিগর তালাকপ্রাপ্ত সবিতা ডালী বলেন, স্বামীর সংসার অনেক আগেই শেষ হয়েছে। দুই সন্তান নিয়ে মাছ ধরার খলই তৈরি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলছে।
ভরতকাঠির কবিতা হালদার বলেন, বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে আউড়া তৈরি করেন। তাঁর স্বামী বিভিন্ন এলাকার বাঁশশিল্পের পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু প্লাস্টিক পণ্যের কারণে তাঁদের আয় কমে গেছে। এরপরও পৈতৃক পেশা ধরে রেখেছেন তিনি।
যেভাবে তৈরি হয় বাঁশের পণ্যগয়েসকাঠির বাঁশশিল্পের মালিক পুষ্প রানি জানান, পণ্য তৈরির আগে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশ প্রায় তিন দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরে বাঁশ চিরে ফানা, কণসি, বাঁশের চটি, বেতি, আউড়া ও মাড়াইসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করা হয়। পণ্যের মাপ অনুযায়ী চারপাশ বাঁধাইয়ের জন্য তৈরি করা হয় বাঁশের সুতি।
এরপর নারীদের নিপুণ হাতে এসব উপকরণ দিয়ে ঝুড়ি, চাটাই, ডালি, হাতপাখা, কুলা, চালুন, ঝাড়ু, খুঁচি, ভাত-তরকারি রাখার ঝাঁপা, মাছের খাঁচা, মাছ ধরার খলই, পশুর হাত থেকে গাছ রক্ষার খাঁচা, মুরগির বাচ্চা রাখার খলই, পুরা, খাড়াই, ঝাড়ঝড়ি, ঢাকনা, বইপত্র রাখার র্যাক এবং ধান-চাল রাখার মোড়াসহ প্রায় ২০ থেকে ২২ ধরনের পণ্য তৈরি করা হয়।
বার্ধক্যেও থামেনি কাজদেবদাসকাঠির ৭০ বছর বয়সি বর্ষীয়ান বাঁশশিল্পী হরিমন বিবি এখনো কাজ করেন। ২২ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। ছেলেমেয়েরাও তেমন খোঁজখবর নেন না। বৃদ্ধ বয়সে বাঁশের আশ তৈরি করে যা আয় করেন, তা দিয়েই জীবন কাটছে তাঁর।
হরিমন বিবি বলেন, রোগবালাই লেগেই আছে। ওষুধ কিনতেই অনেক টাকা চলে যায়। আগের মতো কাজ করতে পারেন না। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে খাবেন, সেই দুশ্চিন্তাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়।
প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসচেতন মহলের মতে, বাঁশশিল্প ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও এ শিল্প রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ খুবই সীমিত। ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
স্বরূপকাঠি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) ম্যানেজার মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশশিল্পকে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তারা যাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।
তথ্যসূত্র: স্থানীয় সূত্র, গ্রামীণ নারীদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি (গ্রামউকসক) এবং স্বরূপকাঠি বিসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক