বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় তাঁর আবির্ভাবের সময় সেখানকার শাসক ছিলেন নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, এ দেশেও গণতন্ত্রকামী জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ‘কংস’রূপী সেই ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে।
‘সবাই নিজেদের বাংলাদেশি ভাবি’প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলন থাকে। বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্যও এখানেই। দেশে যারা ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে বিবেচিত, ইউরোপ বা আমেরিকা সফরে গেলে তারাই আবার কথিত ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে যান। তাই বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু পরিচয় মুখ্য বিষয় নয়। সবাইকে নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও পরিচয় যেন বিভেদ-বৈষম্যের কারণ না হয়—এ উপলব্ধি থেকেই দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য স্বাধীনতার ঘোষকের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের সবার গর্বিত পরিচয়—আমরা বাংলাদেশি।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের মানুষেরা রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ-বিরোধ জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা চালিয়েছে। সমাজবিরোধী অপশক্তি যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যেন সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বানতারেক রহমান বলেন, সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিদ্বেষ যাতে সামাজিক অস্থিরতার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতা দেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। অন্যদিকে নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবে। রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলাপের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা।
তিনি বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার-আমার-আমাদের সকলের অধিকার সমান।’
নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, বিএনপি বিশ্বাস করে—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ শুভ জন্মাষ্টমীর পর আসন্ন দুর্গাপূজাসহ সব ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব যেন মানুষ শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পালন করতে পারে, সে জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছার পাশাপাশি দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তারেক রহমান।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক