২৪ জুলাই ২০২৪—কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে চলমান সহিংসতা ও দমন-পীড়নের মধ্যে দিনটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও উত্তাল অধ্যায়গুলোর একটি। সেদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, ব্যাপক গ্রেপ্তার, হতাহতের ঘটনা এবং একই সময়ে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একদল জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বৈঠক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২০১ জন ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সূত্রে নিহতের সংখ্যা তিন শতাধিক বলে দাবি করা হয়। এ সময় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়। ২৪ জুলাই একদিনেই প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকাতেই গ্রেপ্তার হন ৬৪১ জন। আট দিনের ব্যবধানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারে পৌঁছায়।
একই দিনে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকা কয়েকটি মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় আটজনকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয় বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজে তল্লাশি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
শিশুর মৃত্যুতে শোকের ছায়া
সেই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল নারায়ণগঞ্জের সাড়ে ছয় বছর বয়সী শিশু রিয়া গোপের মৃত্যু। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজ বাসার ছাদে বাবার কোলে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয় রিয়া। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। বাবার আবেগঘন বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সমন্বয়কদের গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক—আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রশিদুল ইসলাম রিফাত—১৯ জুলাই নিখোঁজ হওয়ার পর ২৪ জুলাই তাদের চোখ বাঁধা অবস্থায় রাজধানীর পৃথক স্থানে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন।
মুক্ত হওয়ার পর আসিফ মাহমুদ জানান, আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। আবু বাকের মজুমদারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, তাকে একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। রিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকেও তার নিরাপদে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
গণভবনের বৈঠক নিয়ে বিতর্ক
২৪ জুলাই এডিটরস গিল্ডের ব্যানারে ৩৭ জন সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে মতবিনিময় করেন। ওই বৈঠককে ঘিরে পরবর্তীতে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক আন্দোলনকে ‘নাশকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, আল জাজিরার সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা এবং মাদ্রাসাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর মতো বিভিন্ন পরামর্শও বৈঠকে উঠে আসে।
বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন মোজাম্মেল হক বাবু। এছাড়া আবেদ খান, শ্যামল দত্ত ও নঈম নিজামসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বক্তব্যও পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
সরকারের কঠোর অবস্থান
সেদিনের বিভিন্ন বক্তব্যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বিদেশি মহল বাংলাদেশে বলপ্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা জানায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২৪ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই দিনের সহিংসতা, গণগ্রেপ্তার, সমন্বয়কদের গুমের অভিযোগ এবং গণভবনের বৈঠক—সব মিলিয়ে দিনটি এখনও জনমনে গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক