বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতিই নয়, একই সঙ্গে কয়েকগুণ বেড়ে যায় বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগসহ নানা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এ সময় নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রথম শর্ত হলো নিরাপদ পানি পান করা। দূষিত পানি পান করলে সহজেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পানির উৎস নিরাপদ না হলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে তা পান করতে হবে। ফুটানোর সুযোগ না থাকলে প্রতি ১০ লিটার পানিতে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করার পর সেই পানি ব্যবহার করা উচিত।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর টিউবওয়েল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। টিউবওয়েলের চারপাশ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করে কয়েক বালতি পানি পাম্প করে ফেলে দেওয়ার পরই সেই পানি পান ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা নিরাপদ।
এ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তাই বাসি খাবার বা বন্যার পানিতে ভেজা কোনো খাবার খাওয়া উচিত নয়। রান্না করা খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং মাছ, মাংস ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে সম্পূর্ণ সেদ্ধ করে রান্না করতে হবে।
খাবার গ্রহণের আগে, রান্নার সময় এবং টয়লেট ব্যবহারের পর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
দীর্ঘ সময় বন্যার পানিতে থাকলে ত্বকে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। তাই পানি থেকে উঠে দ্রুত পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে শরীর ধুয়ে শুকনো কাপড় পরতে হবে। আঙুলের ফাঁকে চুলকানি বা ছত্রাকের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম বা পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে।
বন্যার সময় সাপ ও বিভিন্ন বিষাক্ত পোকামাকড় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে। এ কারণে মেঝেতে না ঘুমিয়ে উঁচু খাট বা চৌকিতে ঘুমানো এবং রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট ব্যবহার করা নিরাপদ।
সাপে কামড়ালে আতঙ্কিত না হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ওঝা বা কবিরাজের শরণাপন্ন হওয়া উচিত নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাপের বিষের প্রতিষেধক (অ্যান্টিভেনম) বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিয়েছেন, দুর্যোগের সময় ঘরে বা জরুরি ব্যাগে ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ওষুধ মজুত রাখতে। ডায়রিয়া বা বমি শুরু হলে শরীরের পানিশূন্যতা রোধে দ্রুত ও ঘন ঘন ওরস্যালাইন পান করানো অত্যন্ত জরুরি।
বন্যাকালে সামান্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই অনেক প্রাণঘাতী রোগ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার