বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, বাণিজ্য ও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্ধশতাব্দীর কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াওইউতাইয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি জানান, এসব সমঝোতা স্মারকের আওতায় বিনিয়োগ সহযোগিতা, সবুজ উন্নয়ন, যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগ, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যম সহযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য চীনের ঋণের সুদের হার কমানো এবং ঋণ পরিশোধে গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের আওতায় শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে স্কুল কারিকুলাম এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা সংক্রান্ত দুটি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষা, স্কলারশিপ এবং সহজ ভিসা সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে নতুন চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদনমুখী শিল্পে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বেইজিং।
তিনি আরও জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরিকল্পনা প্রণয়ন, যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি), পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ড্রেনেজ উন্নয়নে চীন কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কাঁঠাল, ফলমূল, শাকসবজি, মৎস্য, ওষুধ, সিরামিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল বাণিজ্যিকভাবে চীনে রপ্তানির সুযোগও নিশ্চিত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, চীন তাদের কিছু উৎপাদন শিল্প নতুন বাজারে স্থানান্তর করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের সড়ক, সেতু, টানেল, বন্দর, সবুজ জ্বালানি এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে চীন ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ (পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি) বৃদ্ধির বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হলে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে চীন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও চীন ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ সব ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, চীন সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যে মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে, তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার