সামরিক 'বাহিনীর এবার ক্যান্টনমেন্টে' ফেরার পালা
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হয়নি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর বিষয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের একটি ঘোষণাই বদলে দেয় আন্দোলনের গতিপথ। ঐতিহাসিক এক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয় ছাত্র-জনতার। অনিবার্য গৃহযুদ্ধ ও রক্তবন্যার হাত থেকে রক্ষা পায় দেশ। টানা তিনদিন সরকারবিহীন দেশের দায়িত্ব নিজেদের স্কন্ধে তুলে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে কার্যকর সহায়তার পাশাপাশি জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ১৮ মাসের মধ্যেই একটি জাতীয় নির্বাচনের বন্দোবস্ত করে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী।
ক্ষমতা নয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সশস্ত্র বাহিনীর চেইন অব কমাণ্ড অটল-অনড় থাকায় চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে দিয়ে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই অস্থিতিশীল-অস্থির সময় জয় করে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিতের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী প্রমাণ করেছে দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে সহায়ক শক্তি তাঁরাই। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দায়িত্বশীলতায় দেশপ্রেমের অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। ক'দিন আগে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিও দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংহত করতে জনগণের ভালোবাসায় ধন্য সশস্ত্র বাহিনীর অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় ২০ মাস। স্বাধীনতার পর এতো দীর্ঘ সময় আর কখনও ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকেনি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যখন জনরোষে প্রাণভয়ে থানা ফেলে পালিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা তখন গভীর শূন্যতায় হাল ধরে সামরিক বাহিনী। আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে তারা অভ্যস্ত না হলেও 'স্ট্রাইকিং ফোর্স' হিসেবে বলপ্রয়োগ বা শক্তি না দেখিয়ে বন্ধুর মতো মানুষকে বুঝিয়েছে। ধৈর্য্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। অকুতোভয় সৈনিকের মতো পুলিশেরও পাশে থেকেছে। তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফেরানোর পাশাপাশি ঘুরে দাঁড় করাতেও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ে পুলিশের নতুন নেতৃত্বে বাহিনীটিতে ক্রমশ শৃঙ্খলা ফিরছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকারের বয়স তিন মাস ছুঁই ছুঁই। এই সময়টিতে পুলিশ নিজেদের গুছিয়ে তুলছে পুরোদমে। এবার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার কাণ্ডারি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর স্থায়ী ঠিকানা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবার পালা। দীর্ঘ মেয়াদে বেসামরিক দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর উন্নত কঠোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহি:শত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আধুনিক সমরকৌশলের মাধ্যমে দ্রুত শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য পুরোমাত্রায় মাঠপর্যায়ের অনুশীলন ও ফরমেশন ট্রেনিং ও সামরিক পরিবেশ বা আবহের আর কোন বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিরক্ষার এই প্রধান স্তম্ভটিকে নিজেদের স্বাভাবিক দায়িত্বে মনোযোগী হতে দিলে জাতির অস্তিত্ব ও মর্যাদাও সুসংহত হবে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, গত ২০ মাসে দিন-রাত একাকার করে কাজ করেছেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। লম্বা সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে গিয়ে নিজ নিজ পরিবার থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে। দেশের জন্য নিজেদের আনন্দ উৎসর্গ করেছে। চেনা আবহের সামরিক পরিবেশের বাইরে থেকে তারা এখন ক্লান্তও, প্রয়োজন বিশ্রামের। সর্বদা পেশাদারিত্বের ছাপ রাখলেও অসামরিক পরিমণ্ডলও কখনও কখনও মনোবলকে প্রভাবিত করে। সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করেই সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে দ্রুত ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জোর তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর।
সামরিক বাহিনী আপন ঠিকানায় ফিরে গেলে পুলিশসহ অন্যরা নিজেদের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা যাচাই করতে পারবে। সামরিক বাহিনী দিনের পর দিন ব্যারাকের বাইরে থেকে এই কাজটি করবে এটি প্রত্যাশাও ভূ-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণে আত্মঘাতী। বিভিন্ন বাহানায় জাতির আস্থা-বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতার প্রতীক এই বাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যস্ত রাখলে জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। সশস্ত্র বাহিনী সংকটময় মুহুর্ত থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণে পথ দেখিয়ে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। এখন নিজেদের মূল পেশাগত দায়িত্বে ফোকাস করতে পারলেই সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরীরা নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে পারবে বাংলাদেশকে। পেশাগত আধুনিক প্রশিক্ষণ, কৌশলগত চিন্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের সময়োপযোগীতার মানদণ্ডে ভাবমূর্তিকেও করবে আরও উজ্জ্বল।
সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তার বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেছেন, ‘শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। আজ জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষা বা প্রচলিত সামরিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, তথ্যযুদ্ধ, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো বহুমাত্রিক হুমকি এর অন্তর্ভুক্ত।'
ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রায় এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং বিমান বাহিনীর প্রায় ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ২০৬টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন আছেন। ৬৪ জেলায় বর্তমানে ক্যাম্পের সংখ্যা অর্ধশত। সংসদ নির্বাচনের পর বেশিরভাগ ক্যাম্প উঠিয়ে নেয় সেনাবাহিনী। মাঠপর্যায় থেকে সেনাবাহিনীর সব সদস্যকে চূড়ান্ত প্রত্যাহার করতে বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানিয়েছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৪ সালের আগস্টেই বলেছিলেন, 'সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যেতে চায়। পুলিশ পুনর্গঠিত হলে সেনাসদস্যরা নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।' সংসদ নির্বাচনের পর সেনাপ্রধান গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, 'নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।'
আশার খবর হচ্ছে সপ্তাহখানেক আগে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ৬ জুন থেকে সেনাসদস্যদের চূড়ান্ত প্রত্যাহার শুরু হবে। দূরবর্তী জেলা থেকে প্রথমে প্রত্যাহার হবে, পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে বিভাগীয় শহর এবং বড় জেলা থেকে তুলে আনা হবে। জুন মাসের মধ্যেই সেনাবাহিনীর সব সদস্যকে মাঠপর্যায় থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিশেষ দায়িত্ব পালনে মাঠে থাকা সেনাবাহিনী পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে ব্যারাকে ফিরে যাবে। তিনি বলেন, ‘সরকারের চাহিদা ও বিদ্যমান আইন মেনেই সেনাবাহিনী বর্তমানে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে এবং প্রয়োজন শেষ হলে তাঁদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তারা স্থায়ীভাবে মাঠে থাকবে না।' এ সময় নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান তাঁর পাশে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তারেক রহমান মনে করেন 'একটি ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র বাহিনী থাকলে বাংলাদেশকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না।' সম্প্রতি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ দরবারে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন-দেশের প্রতিটি নাগরিক সশস্ত্র বাহিনীকে শুধু শেষ ভরসার আশ্রয় হিসেবেই দেখেন না; বরং সাহস, দৃঢ়তা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবেও তারা আপনাদের দেখে।' সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ক্রমাগত উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই বলেও অভিমত সরকারপ্রধানের। তিনি বলেন, 'আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রকে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে নয়, বরং কৌশল ও দক্ষতা দিয়ে মোকাবেলা করতে হয়। এর জন্য সমন্বয় ও কৌশলগত চিন্তাশক্তির সংমিশ্রণ থাকতে হবে অবশ্যই।' প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে এখনই দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর ব্যারাকে ফেরার উপযুক্ত সময়।
তাদের অবিচল লক্ষ্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুরোমাত্রায় রণপ্রস্তুতির কার্যকর বহি:প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। বহি:শত্রুর আগ্রাসন রুখে দিতে ঐকান্তিক মিলনের শপথেই এক সুতোয় গাঁথবেন নিজেদের। উজ্জ্বল-গৌরবময় পথপরিক্রমার ধারাবাহিকতায় নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ে নতুন প্রত্যাশায় সম্ভাবনার পথে স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণে তারা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থেকে জানিয়ে দিবে- ‘বাংলার মাটি, দুর্জয় ঘাঁটি’।
লেখক : সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক