আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। সামর্থ্যের বাইরে কেনাকাটা, ন্যূনতম বিল পরিশোধের ওপর নির্ভরতা এবং নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ না করার প্রবণতা আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই কার্ডের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর নিয়মকানুন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ক্রেডিট কার্ড যেভাবে ঋণে পরিণত হয়ক্রেডিট কার্ড মূলত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া একটি ঋণসুবিধাভিত্তিক পেমেন্ট কার্ড। এর মাধ্যমে গ্রাহক নির্ধারিত ঋণসীমার মধ্যে পণ্য কেনা ও বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংককে সেই অর্থ ফেরত দিতে হয়।
অন্যদিকে, ডেবিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা অর্থ সরাসরি খরচ হয়। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে নিজের হিসাব থেকে কেটে নেওয়া হয় না। ফলে অনেক গ্রাহক খরচের প্রকৃত চাপ তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না।
বিশেষ করে একাধিকবার কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করলে মাস শেষে মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো বিল পরিশোধ করতে না পারলে প্রযোজ্য সুদ ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাকের প্রলোভনগ্রাহক আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ডে নানা ধরনের অফার দিয়ে থাকে। নির্দিষ্ট দোকান, অনলাইন শপিং, বিমান টিকিট, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ছাড়ের পাশাপাশি ক্যাশব্যাক, কিস্তিতে কেনাকাটা এবং রিওয়ার্ড পয়েন্ট অর্জনের সুযোগও রয়েছে।
তবে এসব অফারের সঙ্গে বিভিন্ন শর্ত যুক্ত থাকে। নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনাকাটা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে লেনদেন, সর্বোচ্চ ছাড়ের সীমা কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেনাকাটার মতো শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে বিজ্ঞাপনে বড় অঙ্কের ছাড়ের কথা বলা হলেও সব গ্রাহক সমান সুবিধা পান না।
সমস্যা তৈরি হয় যখন গ্রাহক প্রয়োজনের পরিবর্তে ছাড় পাওয়ার আশায় কেনাকাটা করেন। যে পণ্য কেনার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, শুধু অফারের কারণে সেটি কিনে ফেললে সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যায়। আবার একাধিক অফারের সুবিধা নিতে গিয়ে অনেকে নিজের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরেও খরচ করেন। এতে সাময়িক সাশ্রয়ের আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত বাড়তি ঋণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ন্যূনতম বিল পরিশোধের ঝুঁকিক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ন্যূনতম অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এটিকে ঋণমুক্তির সমাধান মনে করা ঠিক নয়। ন্যূনতম বিল পরিশোধ করলে বকেয়া অর্থের বড় অংশ পরবর্তী মাসে থেকে যায়। কার্ডের শর্ত অনুযায়ী সেই বকেয়া অর্থের ওপর সুদ আরোপ হতে পারে।
ফলে এক মাসের বকেয়া পরবর্তী মাসে আরও বড় অঙ্কে পরিণত হয়। নিয়মিত শুধু ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করতে থাকলে ঋণ পরিশোধের সময় দীর্ঘ হয় এবং মোট সুদের পরিমাণও বাড়তে পারে।
ঋণের ফাঁদ এড়াতে করণীয়ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আর্থিক ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রথমত, নিজের মাসিক আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা করে কেনাকাটা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি লেনদেনের হিসাব রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া কার্ডের সুদের হার, বিল পরিশোধের শেষ তারিখ, বার্ষিক ফি, বিলম্ব মাশুল, নগদ উত্তোলন চার্জ ও অন্যান্য শর্ত আগে থেকেই জেনে নেওয়া প্রয়োজন। শুধু ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাকের আকর্ষণে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে বিরত থাকাও জরুরি।
ক্রেডিট কার্ড আর্থিক লেনদেনকে সহজ করতে পারে, তবে এটি নিজের অতিরিক্ত আয় নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নেওয়া ঋণ। তাই পরিকল্পিত ব্যবহার ও সময়মতো পরিশোধের অভ্যাস না থাকলে সুবিধাজনক এই আর্থিক মাধ্যমই ব্যক্তিগত অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)