শাহজালালে যাত্রী ভোগান্তির শেষ নেই, দেড় বছরে ২০ হাজার অভিযোগ

  • প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৭ দুপুর
  • ৩৬৭৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। লাগেজ পেতে বিলম্ব, লাগেজ হারানো, কেটে মালামাল চুরি, ভাঙচুর, ট্রলি সংকট, চেকইন ও ইমিগ্রেশনে হয়রানি, অযাচিত জিজ্ঞাসাবাদ এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দুর্বলতা—নানা অভিযোগে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে হটলাইন ও ওয়েবসাইটে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা জমা পড়েছে।

এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই হারানো জিনিস খোঁজার শাখা ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট অভিযোগ ও জিজ্ঞাসার ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশের সমাধান করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল অভিযোগই বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও লাগেজ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে।

লাগেজ নিয়ে দুর্ভোগ

চীন থেকে দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ব্যবসায়ী নাঈমুল ইসলাম। তার অভিযোগ, অন্য এক যাত্রীর স্বর্ণের বার ওজনের ক্ষেত্রে আপত্তি জানানোয় তাকে কাস্টমস, এনএসআই ও এসবিসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

নাঈমুলের ভাষ্য অনুযায়ী, তার সঙ্গে থাকা স্যাম্পল হিসেবে আনা একটি ফোল্ডিং ওয়াটার স্টোরেজ ব্যাগকে অনুমোদিত পণ্যের তালিকায় না থাকার অভিযোগে জটিলতা তৈরি করা হয়। পরে ১৯৬৯ সালের কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৫০ সালের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট অ্যাক্ট এবং ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা আইনে তাকে দায়ী করে ৩৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। প্রায় ৪০ হাজার টাকা মূল্যের লাগেজ ও মালামাল আটকে রাখা হয়। জরিমানার টাকা পরিশোধের পরও তিনি সেগুলো ফেরত পাননি বলে অভিযোগ করেন।

তার অভিযোগ, লাগেজ হারানো, কেটে মালামাল চুরি, ভেঙে ফেলা, লাগেজ বুকিংয়ের সময় ওজন নিয়ে হয়রানি, ইমিগ্রেশনে অযাচিত জিজ্ঞাসাবাদ এবং শরীর তল্লাশির নামে হয়রানির মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

ট্রলির জন্যও ভোগান্তি

বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়ার অভিযোগও পুরোনো। একটি ট্রলির জন্য যাত্রীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক যাত্রী হয়রানির আশঙ্কায় লাগেজ হারানো বা নষ্ট হওয়ার পরও অভিযোগ করতে চান না।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিয়মিত ঢাকায় আসা এক দ্বৈত নাগরিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হয়রানির ভয়ে তিনি লাগেজ না নিয়ে শুধু হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে যাতায়াত করেন। তার মতে, বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্তদের একটি অংশ নিজেদের দায়িত্বকে সেবার বদলে ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন।

তিনি বলেন, সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের পাশাপাশি কর্মীদের মধ্যে সেবার মানসিকতা তৈরি, কার্যকর মনিটরিং এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

টাকা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

শাহজালাল বিমানবন্দরে এয়ারলাইনসগুলোর চেকইন, বোর্ডিং, উড়োজাহাজে মালামাল ওঠানো-নামানো, যাত্রীসেবা, প্রকৌশল ও গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্টের (জিএসই) দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের। এসব সেবার জন্য প্রতিটি এয়ারলাইনস নির্ধারিত হারে ফি পরিশোধ করে।

তবে জনবল, যন্ত্রপাতি ও তদারকির ঘাটতির পাশাপাশি অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এয়ারলাইনস অপারেটরস কমিটির (এওসি) এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য এয়ারলাইনসগুলো প্রতি ফ্লাইটে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ ডলার পর্যন্ত দেয়। এরপরও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়। কখনো বিমানবন্দরের বে-তে উড়োজাহাজকে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। হাইলোডার না পাওয়ায় যাত্রীদের লাগেজ পেতেও কখনো দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে বলে তার অভিযোগ।

জনবল ও সরঞ্জাম সংকট

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শাহজালালে প্রতিদিন ২৭টি এয়ারলাইনসের ১১০ থেকে ১১৫টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটে প্রায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ১৮ ধরনের দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মী রয়েছেন।

তবে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও ফ্লাইটের তুলনায় এই জনবল ও সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আগমনী টার্মিনালে এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বহির্গমন টার্মিনালে যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। একসঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এলে বোর্ডিং ব্রিজ, কাস্টমস, চেকইন ও ইমিগ্রেশন এলাকায় চাপ বেড়ে যায়।

জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে কখনো উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামাতেই দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

‘বিশ্বসেরা ১০০’-তেও নেই

যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা স্কাইট্র্যাক্সের বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় শাহজালাল বিমানবন্দর স্থান পায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ১০ বিমানবন্দরের তালিকাতেও নেই এটি।

২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত ওই জরিপে ১০০টির বেশি দেশের যাত্রী অংশ নেন। ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দরের বিভিন্ন সেবা মূল্যায়ন করা হয়। চেকইন, আগমন, ট্রানজিট, নিরাপত্তা তল্লাশি, ইমিগ্রেশন ও বোর্ডিংসহ পুরো যাত্রার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ তালিকায় টানা ১৪তমবারের মতো শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর। দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন এবং তৃতীয় জাপানের টোকিও হানেদা।

যাত্রীদের অভিজ্ঞতাতেও ক্ষোভ

ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপ অ্যাডভাইজারে শাহজালাল বিমানবন্দর নিয়ে যাত্রীদের বিভিন্ন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এক পর্যালোচনায় একজন যাত্রী বিমানবন্দরকে ছোট ও ভিড়ে ঠাসা এবং কার্যক্রমকে ধীরগতির বলে উল্লেখ করেন। আরেক যাত্রী ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ পেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগা, সহায়তা না পাওয়া ও ওয়াই-ফাই সমস্যার অভিযোগ করেন।

বিমানবন্দর এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন

শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের হওয়ার পর কয়েকজন যাত্রী অস্ত্রের মুখে লাগেজ, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী হারিয়েছেন। একটি চক্র জিজ্ঞাসাবাদে এক বছরে বিমানবন্দর এলাকায় ৫০ থেকে ৬০টি ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

২৬ সংস্থার সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন

বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এপিবিএন, এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ প্রায় ২৬টি সংস্থা কাজ করে। সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, এসব সংস্থার নিজস্ব কর্তৃপক্ষ থাকায় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাছে তাদের সরাসরি জবাবদিহি নেই। ফলে কোনো অনিয়ম দেখা দিলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরকে বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারের আশ্বাস

বিমানবন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সরকারকে সময় দিতে হবে। অতীতে দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মীর অদক্ষতার কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

লাগেজ কাটার অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা হচ্ছে বলে তার মনে হয় না। অতীতে ঘটে থাকলে সেগুলোও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাত্রী হয়রানির অভিযোগগুলোকে পুরোপুরি সত্য নয় দাবি করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট নেই এবং যাত্রী হয়রানিও নেই। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার কথা জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি দেশের প্রবেশদ্বার। ফলে বিমানবন্দরে একজন প্রবাসী, বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী কিংবা পর্যটকের প্রথম অভিজ্ঞতা শুধু যাত্রীসেবার মানই নয়, বরং দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই শাহজালালে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর কার্যকর সমাধান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad